১৯৭৯ সালে জন্ম নেওয়া মনোয়ার ক্লার্কের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকায়। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পাড়ি জমান স্বপ্নের দেশ ইতালিতে। নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতি—সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জিং, তবে নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে তিনি দ্রুতই নিজেকে গড়ে তোলেন। ইতালির মেস্ত্রেতে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন ভেনিসের ঐতিহ্যবাহী Ca’ Foscari University of Venice-এ, সেখান থেকেই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে মনোয়ার ক্লার্ক থেমে থাকেননি। ব্যবসায়িক অঙ্গনে প্রবেশ করে অল্প সময়েই নিজের অবস্থান শক্ত করেন ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে। বর্তমানে ভেনিস সেন্টারে তিনি একাধিক ৩ ও ৪ তারকা মানের হোটেল পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি লন্ডনে রয়েছে তার দুটি সফল রেস্টুরেন্ট এবং বাংলাদেশেও একাধিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে ব্যবসার পাশাপাশি তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়—রাজনীতিবিদ। ২০০৮ সালে ইতালির স্থানীয় রাজনৈতিক দল “Venezia è tua”-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে ভেনিস সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
মনোয়ার ক্লার্কের বিশেষ শক্তি তার ভাষাগত দক্ষতা। ইতালিয়ান ভাষায় সাবলীলতার পাশাপাশি ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন তিনি। এই বহুভাষিক দক্ষতা তাকে ইতালিয়ান সমাজ ও প্রশাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হতে সহায়তা করেছে, যা তার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।
প্রবাসী কল্যাণে তার ভূমিকা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ পরিষদ ইতালির জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা, সামাজিক সহায়তা এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় তার অবদান প্রশংসিত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ২০২২ সালে তার নেতৃত্বে ইতালির তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Luigi Di Maio-এর সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয় এবং পরবর্তীতে সেসব সমস্যার অনেকাংশই সমাধানের পথে এগিয়ে যায়—যা তার কূটনৈতিক দক্ষতার একটি বড় উদাহরণ।
বর্তমানে ভেনিসের আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোয়ার ক্লার্ক নতুন করে আলোচনায়। তার লক্ষ্য স্পষ্ট—ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং প্রবাসীদের মূলধারার রাজনীতিতে আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন,
“ভেনিস একটি বিশ্বখ্যাত পর্যটন ও বাণিজ্যিক শহর। এখানে আমাদের প্রবাসীদের বড় একটি অংশ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমি নির্বাচিত হলে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে কাজ করব।”
ইতালির জাহাজ নির্মাণ শিল্প, বিশেষ করে Fincantieri-এর মতো প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে—এই বিষয়টি ইতালিয়ান সরকারের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। তার বিশ্বাস, প্রবাসীদের অবদান স্বীকৃতি পেলে তাদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার আরও সুদৃঢ় হবে।
ব্যক্তিজীবনে মনোয়ার ক্লার্ক একজন পারিবারিক মানুষ। তিনি এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় তার বিশ্বাস—সঠিক লক্ষ্য, পরিশ্রম এবং সততা থাকলে বিদেশের মাটিতেও দেশের নাম উজ্জ্বল করা সম্ভব।
ভেনিসে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি তার নেতৃত্ব ও উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং আসন্ন নির্বাচনে তার বিজয় নিয়ে আশাবাদী।

✍️ মন্তব্য লিখুন