বিপি রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ক্রমবর্ধমান ঘাটতির কারণে সাধারণ সংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়ছে এবং এর প্রভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। এর ফল হিসেবে দ্রুত বাড়ছে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (এএমআর)—যেখানে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আর কার্যকর থাকে না। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি দেশের জন্য এক নীরব মহামারিতে রূপ নিতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপের (গার্প) উদ্যোগে One Health Trust এবং icddr,b যৌথভাবে প্রকাশিত এক পলিসি ব্রিফে এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে ৫১ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩৫০ জনের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা নিয়ে অনাস্থার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের ঘাটতি শুধু সংক্রমণ বাড়ায় না, বরং চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে তোলে। অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণু ধীরে ধীরে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এতে সাধারণ সংক্রমণও ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
পলিসি ব্রিফে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু এএমআরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শুধু ২০২১ সালেই দেশে ৯৬ হাজার ৮৭৮ জনের মৃত্যু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৪৫৪টি মৃত্যু সরাসরি ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটেছে।
অনুষ্ঠানে গার্প-বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী Dr. Wasif Ali Khan বলেন, “ভ্যাকসিন শুধু রোগ প্রতিরোধের উপায় নয়, এটি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর অন্যতম কার্যকর ও সাশ্রয়ী মাধ্যম। সংক্রমণ কমলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনও কমে যায়, ফলে প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকিও হ্রাস পায়।”
তিনি আরও বলেন, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব প্রমাণ করে টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য অর্জনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে Dr. Eili Klein, যিনি ওয়ান হেলথ ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত, বলেন যে এএমআর মোকাবিলায় শুধু নজরদারি নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে বিশেষজ্ঞরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ টিকার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এগুলো হলো—
নিউমোকোকাল কনজুগেট ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করে উন্নত সংস্করণ চালু করা
টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিনকে স্থায়ীভাবে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা
শিশুদের ডায়রিয়া ও মারাত্মক সংক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন চালু করা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে একদিকে যেমন রোগ কমবে, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এখন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়; এটি ইতোমধ্যেই বাস্তব সংকটে পরিণত হয়েছে। আর এই সংকট মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচিকে জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
✍️ মন্তব্য লিখুন