দেশে প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে হাম, ডেঙ্গু ও জলাতঙ্কের টিকা এবং সাপের কামড়ের প্রতিষেধক অ্যান্টিভেনোম উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে Essential Drugs Company Limited (ইডিসিএল)। আগামী এক বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের জুন থেকেই সরকারকে এসব টিকা ও প্রতিষেধক সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আ. সামাদ মৃধা জানিয়েছেন, দেশে ডেঙ্গু, হাম, জলাতঙ্ক ও সাপের কামড়জনিত ঝুঁকি বাড়তে থাকায় জরুরি ভিত্তিতে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
প্রাথমিকভাবে ইডিসিএলের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। এজন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। প্রকল্প চালু হলে বছরে প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি ভায়াল টিকা ও অ্যান্টিভেনোম উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে দেশে এই চার ধরনের টিকা ও প্রতিষেধকের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ ডোজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ থেকে আমদানির তুলনায় প্রায় অর্ধেক খরচে সরকার এসব সংগ্রহ করতে পারবে। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে সংকটকালীন সময়ে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাও সহজ হবে। দেশীয় চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রফতানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত ১০ মে পর্যন্ত দেশে মোট ৫৫ হাজার ৯৭৮ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা সরবরাহ ও টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে দেশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা ও সাপের কামড়ের প্রতিষেধকেরও দীর্ঘদিনের সংকট রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন এবং ৭ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ফলে স্থানীয়ভাবে অ্যান্টিভেনোম উৎপাদনের উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ভ্যাকসিন ও রিসার্চ কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ইডিসিএল। Asian Development Bank–এর অর্থায়নে ১০ একর জমির ওপর নির্মিতব্য এ কমপ্লেক্সে ভ্যাকসিন গবেষণা, বায়োটেকনোলজি পণ্য উন্নয়ন এবং ওষুধ উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ২০৩২ সালের মধ্যে সেখানে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সফল হলে বাংলাদেশ শুধু টিকা আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভ্যাকসিন উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
✍️ মন্তব্য লিখুন