দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য মাসের শুরু মানেই অনিশ্চয়তার আরেক নাম। অন্য চাকরিজীবীরা যখন নির্ধারিত সময়েই বেতন পেয়ে মাসিক হিসাব মেলানোর সুযোগ পান, তখন স্কুল-কলেজের লাখো শিক্ষক পরিবার অপেক্ষা করেন একটি মোবাইল এসএমএসের জন্য। মে মাসের ১০ তারিখ পেরিয়ে গেলেও বেতন না পাওয়ার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—এই দায় আসলে কার?
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় পৌনে চার লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। তাদের অধিকাংশের সংসার পুরোপুরি মাসিক বেতনের ওপর নির্ভরশীল। নির্ধারিত সময়ে বেতন না এলে সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বাড়িভাড়া কিংবা ঋণের কিস্তি—সবকিছুতেই চাপ তৈরি হয়। অথচ এই বাস্তবতা যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বহীন হয়ে আছে।
বেতন প্রদানে গতি ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সরকার EFT (Electronic Fund Transfer) পদ্ধতি চালু করেছিল। ডিজিটাল এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত বেতন পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন। প্রায় প্রতি মাসেই শিক্ষকদের ১০ কিংবা ১১ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কখনও বৃহস্পতিবার রাতে বেতন জমা হয়, আবার ছুটির কারণে কেউ কেউ আরও দুই-তিন দিন পর টাকা তুলতে পারেন। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে এমন বিলম্ব শুধু হতাশাজনক নয়, বরং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, EFT চালুর আগেও অন্তত মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বেতন পাওয়া যেত। এখন আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার পরও কেন পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক—কেউই প্রকাশ্যে দায় স্বীকার করে না। ফলে প্রতি মাসেই একই সংকট তৈরি হলেও জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেতন প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রশাসনিক ধাপ থাকলেও সমন্বয়হীনতার কারণেই মূলত বিলম্ব বাড়ছে। ফাইল অনুমোদন, অর্থ ছাড়, ডিজিটাল প্রসেসিং ও ব্যাংকিং কার্যক্রমের যেকোনো ধাপে ধীরগতি পুরো ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু বছরের পর বছর একই চিত্র চলতে থাকলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
এদিকে শিক্ষক সমাজের একটি অংশের প্রশ্ন আরও গভীর। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অর্থ ছাড় আটকে রেখে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা বা লভ্যাংশ তৈরি হচ্ছে কি না, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ প্রকাশ হয়নি, তবে নিয়মিত বিলম্বের কারণে এমন সন্দেহ তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন শিক্ষক আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকলে তার প্রভাব শ্রেণিকক্ষেও পড়ে। কারণ আর্থিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত একজন শিক্ষক কখনোই পুরো মনোযোগ নিয়ে পাঠদান করতে পারেন না। ফলে শিক্ষকদের বেতনকে কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেতন পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিলম্বের কারণ প্রকাশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বাধ্য করা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কারণ শিক্ষকরা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা চান না—তারা শুধু সময়মতো তাদের ন্যায্য প্রাপ্য চান।
✍️ মন্তব্য লিখুন