ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের মাতৃত্বকালীন সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির গত ৫ জানুয়ারির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। পরে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে সব বিভাগের চেয়ারম্যান ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকদের কাছে সিদ্ধান্তের অনুলিপি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মাতৃত্বকালীন পরিস্থিতিতে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে একধরনের একাডেমিক ছাড়ের পথ খুলল।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে কর্মজীবী নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা পেলেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বিবাহিত নারী শিক্ষার্থীরা এত দিন এমন সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ওঠে এবং পরে ডিনস কমিটিতে তা আলোচনায় আসে।
ডিনস কমিটির কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে তিনটি ছাড়নীতি ও একটি উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন সুপারিশগুলোকে ‘বাস্তবসম্মত’ বলে মত দেন। তবে তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, এমফিল ও পিএইচডি ছাড়া শিক্ষাজীবনের অন্য পর্যায়ে সরাসরি মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান সম্ভব নয়। পরে ডিনস কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, মাতৃত্বকালীন সময়ে পরীক্ষার জন্য উপস্থিতির শর্ত শিথিলযোগ্য হবে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং মাতৃত্বকালীন সময়ে পরীক্ষায় উপস্থিতির শর্ত শিথিল করার বিষয়ে ডিনস কমিটির সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোকে অবহিত করা হলো, যাতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ইউনিটগুলো এখন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রশাসনিক ভিত্তি পেয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও এখনো পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে মাতৃত্বকালীন সুবিধা কতদিনের হবে, কোন প্রক্রিয়ায় তা কার্যকর হবে, কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা মিস করলে তা কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। অর্থাৎ, আপাতত নীতিগতভাবে নমনীয়তা অনুমোদিত হলেও বাস্তব প্রয়োগের কাঠামো নির্ধারণ বাকি রয়েছে।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা জানিয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিটি যাচাই-বাছাই করে মতামত দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসারে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল বা অন্য নীতিনির্ধারণী ফোরামেও যেতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াটিতে গুরুত্ব পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন সুবিধার নজির রয়েছে। ভারতে মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির নিয়ম চালু করে। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী সেমিস্টার পরীক্ষা মিস করলে তা পরবর্তী সেমিস্টারের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়। এছাড়া ২০২৩ সালে কেরালা বিশ্ববিদ্যালয় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির ঘোষণা দেয়, যাতে পুনরায় ভর্তি ছাড়া নির্দিষ্ট সময় পর ক্লাসে ফিরে আসা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে তাই দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে বিদ্যমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন এই সিদ্ধান্ত নারী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক যাত্রায় মাতৃত্বকে প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং বিবেচনাযোগ্য বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্তটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিভাগীয় পর্যায়ে তার একরূপ প্রয়োগের ওপর।
✍️ মন্তব্য লিখুন