আলী আকবর গাজী
২৩ মার্চ ২০২৬
ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এক বিশেষ উপলক্ষ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিতে ঈদ উদযাপিত হলেও এ উৎসবের মূল সুর একটাই—প্রিয়জনের সান্নিধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি করা। তবে প্রবাসীদের জন্য ঈদের অভিজ্ঞতা অনেকটাই আলাদা। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও শিকড় থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তারা নিজেদের মতো করে উৎসবকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা করেন।
প্রবাসজীবনে ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একই সঙ্গে স্মৃতি, আবেগ, অভাববোধ এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা। দেশের বাইরে টানা কয়েকবার ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রবাসের ঈদে আনন্দ আছে, তবে সেই আনন্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক ধরনের নীরব শূন্যতা।
বাংলাদেশে ঈদের আমেজ শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। নতুন পোশাক কেনা, বাজারে মানুষের ভিড়, বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি, আত্মীয়দের সঙ্গে পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ ক্রমেই ঘনীভূত হয়। কিন্তু বিদেশে সেই চিত্র অনেকাংশেই ভিন্ন। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী তৈরি পোশাক বা আয়োজন প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে সবসময় সমানভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে না। অনেক দেশে ঈদকে ঘিরে কেনাকাটার সেই পরিচিত উচ্ছ্বাসও চোখে পড়ে না।
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ও অমুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঈদ উদযাপনের সুযোগ-সুবিধায় কিছুটা পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ প্রবাসীর অভিজ্ঞতায় একটি মিল স্পষ্ট—ঈদে ছুটি তুলনামূলক কম, আর উৎসবের প্রস্তুতিও সীমিত। কোথাও ঈদের আগে–পরে অল্প কয়েক দিনের ছুটি মিললেও, সেটি বাংলাদেশের মতো দীর্ঘ ও ব্যাপক সামাজিক আবহ তৈরি করতে পারে না।
তবে ঈদের নামাজকে ঘিরে প্রবাসীদের আগ্রহ ও আবেগ থাকে অটুট। অনেকেই পছন্দের পাঞ্জাবি পরে নামাজে অংশ নেন। কেউ দেশ থেকে সঙ্গে করে পোশাক নিয়ে যান, কেউ আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। নামাজে যাওয়ার সময় সহপাঠী, সহকর্মী বা পরিচিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেখা হলেও, দেশের ঈদের সেই চিরচেনা অনুভূতি—মসজিদের খুতবা, নামাজ শেষে কোলাকুলি, বড়দের সালাম করা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়—বারবার মনে পড়ে।
প্রবাসের ঈদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো পরিবারের অনুপস্থিতি। দেশে ঈদের দিন নামাজ শেষে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে দেখা করার যে সামাজিক রীতি, বিদেশে তার সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে প্রবাসীদের ঈদ-আনন্দের বড় একটি অংশ স্থান করে নিয়েছে অনলাইন যোগাযোগে। নামাজ শেষে ভিডিও কল, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, শিশুদের উচ্ছ্বাস দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করা—এসবই হয়ে ওঠে আনন্দ ভাগাভাগির প্রধান মাধ্যম।
খাবারের প্রসঙ্গ এলে প্রবাসের ঈদে না-পাওয়ার অনুভূতিটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ঈদের সকালের সেমাই, পিঠা, পায়েস, মাংসের নানা পদ—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঘরের স্বাদ, বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্নার আবেগ। অনেক প্রবাসীই বন্ধুদের নিয়ে ছোট পরিসরে রান্না করেন, বাংলাদেশি কমিউনিটি মিলে আয়োজন করেন সেমাই বা বিশেষ খাবারের। তবু পরিচিত সেই স্বাদ ও পারিবারিক উষ্ণতার অভাব সহজে পূরণ হয় না।
তারপরও প্রবাসের ঈদ কেবল বেদনাময় নয়। বরং ভিনদেশে থাকা বাংলাদেশিরা নিজেদের উদ্যোগে এক ধরনের বিকল্প পারিবারিক পরিমণ্ডল তৈরি করেন। কেউ কর্মসূত্রে, কেউ পড়াশোনার জন্য, কেউবা অন্য প্রয়োজনে দেশের বাইরে থাকলেও উৎসবকে কেন্দ্র করে তারা একে অপরের কাছাকাছি আসেন। একসঙ্গে নামাজ আদায়, খাবারের আয়োজন, আড্ডা, ঘুরতে যাওয়া—এসবের মধ্য দিয়েই প্রবাসে গড়ে ওঠে এক অন্যরকম ঈদ-সম্প্রীতি।
প্রবাসজীবনের বাস্তবতায় তাই ঈদ হয়ে ওঠে আনন্দ ও বেদনার মিশ্র এক অভিজ্ঞতা। পরিবার ছাড়া উৎসব পূর্ণতা পায় না, তবু মানুষ আনন্দকে থামিয়ে রাখে না। সীমিত আয়োজন, স্মৃতিভার আর না-পাওয়ার কষ্ট নিয়েও প্রবাসীরা চেষ্টা করেন ঈদের তাৎপর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে। এভাবেই ভিনদেশের মাটিতে ঈদ শুধু একটি উৎসব নয়, হয়ে ওঠে শিকড়কে মনে রাখার, নিজেদের মানুষদের খুঁজে নেওয়ার এবং দূরত্বের মাঝেও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক মানবিক অনুষঙ্গ।
লেখক: আলী আকবর গাজী
শিক্ষার্থী, আল-বুখারী ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এআইইউ), মালয়েশিয়া
✍️ মন্তব্য লিখুন