ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে পাঠ্যক্রম, শ্রেণিকক্ষের কার্যকর পাঠদান এবং শিক্ষার মানে ধারাবাহিক সামঞ্জস্য—এই তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেছেন, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি শিক্ষা; তাই শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল থাকলে উন্নয়নের কাঠামোও টেকসই হয় না।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষে দক্ষ ও কার্যকর পাঠদান এবং সারাদেশে শিক্ষার মানে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।
বর্তমানে দেশে বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি শিক্ষা ও বিভিন্ন ধারার মাদ্রাসাসহ বহুমাত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ধারার মধ্যে মানগত সমন্বয় না হলে জাতীয় শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই একটি সমন্বিত মানদণ্ড তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা যেকোনো ধারায় পড়লেও সমমানের শিক্ষার সুযোগ পায়।
ভাষা ও গণিতে ভিত্তি শক্ত করার ওপর গুরুত্ব
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্ঞান মূলত ভাষার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে ও প্রকাশিত হয়। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় ভাষা ও গণিতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক শিক্ষার্থী মাতৃভাষা বাংলাতেই পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না, যা পরবর্তী শিক্ষাজীবনে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তাই ইংরেজি বা তৃতীয় ভাষা শিক্ষার আগে বাংলায় দক্ষতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রয়োজনে পাঠ্যক্রম পর্যালোচনার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের কথাও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ধাপে ধাপে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে; তবে শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা ও গণিতে দুর্বলতা দূর করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
শিক্ষা প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সব দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। আগামী পাঁচ বছরে মন্ত্রণালয়ের কোথাও দুর্নীতির সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা সহ্য করা হবে না এবং এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে বলে জানান তিনি।
তার ভাষায়, দেশপ্রেমের প্রমাণ শুধু আন্দোলনে নয়, দায়িত্বশীল কর্মসম্পাদনের মধ্য দিয়েও দিতে হয়। একটি দুর্নীতিমুক্ত, মানসম্মত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবে।
একুশের চেতনা ও ভাষার অধিকার
২১ ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি বাঙালির মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ভাষা মানুষের পরিচয়, অনুভূতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাঙালির আত্মত্যাগ ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
তিনি বলেন, অতীতের মতো বর্তমান সময়েও অধিকার আদায়ে সচেতনতা, ত্যাগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। শিক্ষার মাধ্যমে ভাষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে পারলে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সামঞ্জস্য বজায় রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নই টেকসই জাতীয় উন্নয়নের প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
✍️ মন্তব্য লিখুন