নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পবিত্র রমজান মাস শুরু হতেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফলের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। ইফতারের অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত খেজুর, আঙুর, আপেল ও আনারের দাম মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক খাদ্য বাজেটে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, চাহিদা বৃদ্ধি, আমদানি নির্ভরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যয় এবং বাজার মনিটরিংয়ের ঘাটতির সম্মিলিত প্রভাবে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা বাজার, মালিবাগ ও আশপাশের খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, ইফতারকেন্দ্রিক ফলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ ফলের দাম গত ১০ থেকে ১৫ দিনের তুলনায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর ফলের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি।
বাজারে প্রিমিয়াম মানের মেডজুল খেজুর প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মরিয়ম খেজুর ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা, কালমী ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং সুকারী খেজুর প্রায় ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। সাধারণ মানের মিনিফি খেজুরও ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপাদান খেজুর কিনতে গিয়ে অনেক ক্রেতাকে খরচ কমাতে বা বিকল্প বেছে নিতে হচ্ছে।
খেজুরের পাশাপাশি অন্যান্য ফলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। আনার মানভেদে প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬২০ টাকা, কালো আঙুর ৬০০ টাকা এবং সবুজ আঙুর ৪৫০ থেকে ৪৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গ্রিন আপেল ও ড্রাগন ফল ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা, ফুজি আপেল ও নাশপাতি প্রায় ৪০০ টাকা এবং কমলা ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। মালটার কেজি ৩৫০ টাকার আশপাশে থাকলেও দেশি ফলের দামও আগের তুলনায় কমেনি।
তুলনামূলক সাশ্রয়ী ফল হিসেবে বিবেচিত পেঁপে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, পেয়ারা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বেল ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ডজনপ্রতি সবরী ও সাগর কলা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা এবং চম্পা কলা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও রমজানের আগে এসব ফলের দাম আরও কম ছিল বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
রাজধানীর একাধিক বাজারে কথা বলে জানা যায়, রমজানকে কেন্দ্র করে ফলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। খিলগাঁও এলাকার ক্রেতা সম্রাট কবির বলেন, “মাসের শুরুতে যে গ্রিন আপেল ৩২০ টাকায় কিনেছি, এখন সেটি ৪২০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। রোজা এলেই ফলের দাম বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর।”
আরেক ক্রেতা আশরাফুল ইসলাম জানান, “মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সবুজ আঙুরের দাম ৩০০-৩৩০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৪৬০ টাকায় পৌঁছেছে। বাজারে নিয়মিত তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন।”
অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা দাবি করছেন, মূল্যবৃদ্ধির জন্য তারা এককভাবে দায়ী নন। তাদের ভাষ্য, তারা মূলত পাইকারি আড়ত থেকে পরিবর্তনশীল দামে ফল কিনে আনেন এবং সীমিত লাভে বিক্রি করেন। বাদামতলীসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে আমদানিকৃত ফলের দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণজনিত ক্ষতি এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও খুচরা দামের সঙ্গে যুক্ত হয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ফলের বাজারের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলার বিনিময় হার এবং শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন সরাসরি খুচরা মূল্যে প্রভাব ফেলে। রমজান মাসে মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধি এই চাপকে আরও তীব্র করে তোলে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলে বাজারে কারসাজি বা অতিমুনাফার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা নিয়মিত বাজার মনিটরিং জোরদার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় ফলের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।
রমজানের প্রথম দিকেই ফলের দামে এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ মানুষের ইফতার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।
✍️ মন্তব্য লিখুন