আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে বিকল্প তেলের উৎস খুঁজতে তৎপর হয়ে উঠেছে ভারত। এই প্রেক্ষাপটে আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ Venezuela।
জ্বালানি পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি মে মাসে ভারতে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে দেশটি বর্তমানে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম তেল সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। এপ্রিল মাসে যেখানে ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের আমদানি ছিল দৈনিক প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ব্যারেল, মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট নিরাপত্তা সংকটই ভারতকে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। ভারতের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেকই সাধারণত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। একই পথে দেশটিতে প্রবেশ করে বিপুল পরিমাণ এলএনজিও। কিন্তু Iran-কে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই রুটে তেল পরিবহন এখন বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি ভারত সাত বছর পর আবার ইরান থেকে সীমিত পরিসরে তেল আমদানি শুরু করলেও চলমান সংঘাত এবং ইরানি বন্দরের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে মে মাসে সেই সরবরাহ আবারও বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে Saudi Arabia থেকেও ভারতের তেল আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, অন্তত ১৩টি ভারতীয় জাহাজ বর্তমানে ওই অঞ্চলে আটকে আছে। হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপকূলের কাছে কয়েকটি ভারত-সংশ্লিষ্ট জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলেও জানা গেছে। একটি ভারতীয় পতাকাবাহী কার্গো জাহাজে আগুন লাগার পর সেটি ওমানের জলসীমায় ডুবে যায়।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ভাণ্ডার। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (EIA) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Hugo Chávez তেল শিল্পের বড় অংশ জাতীয়করণ করলে বিদেশি কোম্পানির প্রভাব কমে যায়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কা খায়।
বর্তমানে মার্কিন তেল জায়ান্ট [Chevron](https://www.chevron.com?utm_source=chatgpt.com) ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় থাকা একমাত্র বড় মার্কিন কোম্পানি। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান PDVSA-এর সঙ্গে যৌথভাবে দৈনিক প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। পাশাপাশি [ExxonMobil](https://corporate.exxonmobil.com?utm_source=chatgpt.com)-ও আবার ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রও চাইছে ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে যাক। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত রাশিয়া থেকে ব্যাপক পরিমাণে তেল কেনা শুরু করলে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ বাড়ে। এ অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
আগামী ২৩ থেকে ২৬ মে ভারত সফরে যাচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio। সফরে জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বাণিজ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট Delcy Rodríguez-এর ভারত সফরের সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে।
ভারত-ভেনেজুয়েলা জ্বালানি সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০০৮ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ONGC ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। ২০১২ সালে ভারত এশিয়ায় ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতায় পরিণত হয়। বিশেষ করে [Reliance Industries](https://www.ril.com?utm_source=chatgpt.com)-এর গুজরাটের জামনগর রিফাইনারি ভেনেজুয়েলার অতিভারী ও সালফারসমৃদ্ধ তেল পরিশোধনে সক্ষম হওয়ায় এই বাণিজ্য আরও সহজ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি। একদিকে হরমুজ সংকট ভারতের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে নতুন জ্বালানি সমীকরণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ভারত-ভেনেজুয়েলা তেল বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন