আরিফুর রহমান, খুলনা | প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি সুন্দরবনকেন্দ্রিক শুটকি শিল্প এবার দস্যু আতঙ্কে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন দুবলার চরসহ সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলদস্যু ও বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় জেলে, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে মাছ ধরতে গিয়ে মাঝপথেই ফিরে আসছেন শত শত ট্রলার ও নৌকা, যার প্রভাব পড়ছে শুটকি উৎপাদন, বাজার সরবরাহ এবং সরকারি রাজস্ব আহরণে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে গোটা সুন্দরবন অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকাজুড়ে অন্তত ২০টি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ছয় থেকে সাতটি দুর্ধর্ষ বাহিনী পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জসহ সাগরপথ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত এক সপ্তাহেই প্রায় একশত জেলেকে জিম্মি করার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
অপহরণ, মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজিতে জেলেদের আতঙ্ক
স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে সাগর ও উপকূলীয় চরাঞ্চল থেকে একাধিক জেলে অপহৃত হয়েছেন। বনদস্যু ও জলদস্যুদের বিভিন্ন বাহিনী ট্রলারসহ জেলেদের তুলে নিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করছে। অর্থ দিতে না পারলে নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে। ফলে অনেক জেলে ঋণ করে সাগরে গেলেও জীবনঝুঁকির কারণে মাছ ধরা বন্ধ করে ফিরে আসছেন।
একটি ট্রলারে সাধারণত ১৫–২০ জন জেলে থাকেন। জেলেদের অভিযোগ, প্রতি জনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত এবং ট্রলারপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করছে দস্যুরা। ফলে মাছ ধরতে গেলেও লাভের বদলে ঋণের বোঝা বাড়ছে।
শুটকি উৎপাদনে ধসের আশঙ্কা
বনবিভাগ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে দুবলার চর, আলোরকোল, নারকেলবাড়িয়া, শেলারচর, মেহের আলীর চর, মাঝের কিল্লা, সোনাকাটা, আশার চর, চাবরাখালি, কোকিলমনি, কবরখালি, মানিকখালি ও আমবাড়িয়া চরসহ বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি শুটকি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এর মধ্যে দুবলার চর সবচেয়ে বড় শুটকি পল্লী, যেখানে প্রতিবছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ হাজার জেলে কাজ করেন।
কিন্তু চলতি মৌসুমে দস্যু আতঙ্কের কারণে শুটকি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। খুলনার পরিবহন ব্যবসায়ীরা জানান, আগে নিয়মিত ট্রলারে শুটকি আসলেও এখন সরবরাহ কমে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারেও।
ঋণ করে সাগরে, ফিরে আসছেন ক্ষতির বোঝা নিয়ে
জেলে দলনেতারা জানান, শুটকি মৌসুমে অনেকেই ঋণ, অগ্রিম ও সমিতির টাকা নিয়ে মাছ ধরতে সাগরে যান। পরিবারের খরচের জন্য আগেই অর্থ ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু দস্যুদের তৎপরতার কারণে সাগরে অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে লাভের আশায় যাওয়া জেলেরা উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
একজন বাহাদ্দার বলেন, মৌসুমে কয়েক মাসের জন্য উপকূলে অবস্থান করে মাছ ধরা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই চরে থাকতে এবং সাগরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এতে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
রাজস্ব আদায়েও শঙ্কা
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জেলেরা সীমিত আকারে পাস–পারমিট নিচ্ছেন। ফলে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জীবনঝুঁকির কারণে নিয়মিত জেলেরা সাগরে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, অপহৃতদের উদ্ধারে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। দস্যুদের ভয়ে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রাখায় মাছের সংকট তৈরি হয়েছে এবং শুটকি উৎপাদনে ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যৌথ অভিযানের দাবি
জেলে, ব্যবসায়ী ও বনবিভাগের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত টহল ও যৌথ অভিযান জোরদার করা হলে দস্যু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্যথায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক অর্থনীতি, শুটকি শিল্প এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা দীর্ঘমেয়াদে বড় সংকটে পড়তে পারে।
✍️ মন্তব্য লিখুন