নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই দিনের মধ্যেই শিক্ষা খাতে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে তিনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা, শিক্ষক কল্যাণ ও শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কর্মদিবসেই সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান সংকট, অনিয়ম ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন তিনি। দ্বিতীয় দিনেও গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী, যেখানে প্রতিশোধ নয়, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা গুরুত্ব পায়।
—
প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতার ইঙ্গিত
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে থাকা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সফটওয়্যারভিত্তিক ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
তার ভাষ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ধাপে ধাপে অ্যাপভিত্তিক করা হবে এবং বদলি বাণিজ্য বন্ধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা হলে গণমাধ্যমের সামনে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত আছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, পরীক্ষায় নকল বন্ধ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠে ফেরানো এবং মানসম্মত বই সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করাও অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।
—
শিক্ষক কল্যাণে আশ্বাস: উৎসব ভাতা ও বেতন
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি—উৎসব ভাতা শতভাগ করার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। বর্তমানে তারা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেসরকারি শিক্ষকদের ভাতা ও স্বল্প বেতনের বিষয়টি সরকার অবগত এবং এ বিষয়ে কাজ চলছে।
শিক্ষকদের নির্ধারিত সময়ে বেতন প্রদান ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়েও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজে বড় প্রভাব ফেলবে।
—
এমপিওভুক্তি ও বদলি প্রক্রিয়ায় নজরদারি
জাতীয় নির্বাচনের আগে জমা পড়া এমপিওভুক্তির আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। কোনো ধরনের অনিয়ম বা ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনা হবে।
এছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়া দ্রুত চালুর আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
—
শিক্ষাক্রম বদল নয়, হবে রিভিউ
শিক্ষাক্রম হঠাৎ পরিবর্তনের পরিবর্তে ধাপে ধাপে রিভিউ করার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী। এতে বর্তমান পাঠ্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি, যাতে শিক্ষা ব্যবস্থায় মানদণ্ডের সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
—
শিক্ষা উন্নয়নে ১২ দফা উদ্যোগ
শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা খাতের উন্নয়নে একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য
উন্নয়ন বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ
তৃতীয় ভাষা শিক্ষা ধাপে ধাপে চালু
বিজ্ঞান, কোডিং ও রোবোটিক্স শিক্ষার প্রসার
মাধ্যমিকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা
কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে ক্রেডিট ব্রিজ
গবেষণা ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট
পাবলিক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
তিনি বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, শেখার ফলাফল ও বাজেট ব্যবহারের গুণগত মানও মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে।
—
শিক্ষা পরিবারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
শিক্ষা খাতে দ্রুত সিদ্ধান্তমূলক অবস্থান নেওয়ায় শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শিক্ষক নেতারা মনে করছেন, স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই পাওয়া গেছে।
কারিগরি শিক্ষক নেতা রাশেদ মোশাররফ বলেন, ছুটির তালিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ শিক্ষামন্ত্রীর কার্যকর নেতৃত্বের ইঙ্গিত দেয়।
—
জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টস থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্প অগ্রগতি, বই বিতরণ, প্রশিক্ষণ ও ক্লাস ঘণ্টাসহ বিভিন্ন তথ্য প্রকাশে মাসিক পাবলিক ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ধারাবাহিক বক্তব্য, সংস্কারের রূপরেখা ও শিক্ষক-কেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতি শিক্ষা খাতে একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষিত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
✍️ মন্তব্য লিখুন