ঢাকা, ২১ মার্চ ২০২৬: ঈদুল ফিতর আনন্দ, মিলন আর পারিবারিক উষ্ণতার উৎসব। নতুন পোশাক, সেমাই, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা আর নামাজ শেষে কোলাকুলিতে ভরে ওঠে দিনটি। তবে এই উৎসবের আবহেও অনেক মানুষের জীবনে থেকে যায় এক অন্যরকম শূন্যতা—প্রিয়জন হারানোর বেদনা। ঈদ ফিরে আসে প্রতি বছর, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর ফিরে আসেন না।
স্বজনহারা মানুষের কাছে তাই ঈদের আনন্দ অনেক সময় স্মৃতির ভারে নীরব হয়ে যায়। ঘরের ভিড়, উৎসবের ব্যস্ততা কিংবা চারপাশের হাসির মধ্যেও মনে পড়ে যায় অনুপস্থিত কোনো মুখ। যে মানুষটির সঙ্গে একসময় ঈদের সকাল শুরু হতো, সালামি নেওয়া, একসঙ্গে খাওয়া বা নামাজে যাওয়া—তিনি আর নেই। ফলে উৎসবের দিনও বিষাদের এক স্তর নীরবে জড়িয়ে থাকে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এমন অভিজ্ঞতার কথাই জানা গেছে। তাদের ভাষায়, প্রিয়জন হারানোর পর ঈদ আর আগের মতো থাকে না; বরং দিনটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, অশ্রু আর দোয়ার দিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত শাহরিয়া উৎস বলেন, ছোটবেলায় ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই পাড়াজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হতো। বাবা পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকা বের করে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে আসতে বলতেন। তবে টাকার আনন্দের চেয়েও বড় ছিল বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজে যাওয়ার মুহূর্ত। তার ভাষায়, নামাজ শেষে বাবার আলিঙ্গন ছিল এক ধরনের নির্ভরতার আশ্রয়। এখন ঈদের দিন সেই অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। তিনি বলেন, আজ ঈদ মানে নামাজ শেষে বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য দোয়া করা।
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজানা কামাল রিয়া বলেন, কাছের মানুষ হারানোর পর ঈদের অর্থ বদলে যায়। আনন্দের দিনটি তখন বিষাদ, হাহাকার আর না-পাওয়ার অনুভূতিতে ভরে ওঠে। তাঁর কথায়, ঈদের সকাল শুরু হয় কবর জিয়ারত দিয়ে। সেখানে বসে দোয়া করেন, চুপচাপ ঈদ মোবারক বলেন, যদিও কোনো উত্তর আসে না। পরিবারের একাধিক প্রিয়জনকে হারানোর স্মৃতি তাঁকে এখনও তাড়া করে ফেরে। বিশেষ করে বড় বোনের মৃত্যুর পর বহু বছর হাতে আর মেহেদি দেননি বলেও জানান তিনি।
শহীদ আবরার ফাহাদ হলের শিক্ষার্থী মো. পিয়াসুর রহমান হিসাম বলেন, ২০২৪ সালে বাবাকে হারানোর পর থেকে ঈদ আর আগের মতো লাগেনা। ঈদের সকালে বাবার ডাক, নতুন কাপড় দেখে তাঁর হাসি, একসঙ্গে নামাজে যাওয়া—এমন ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। চারপাশে সবাই আনন্দে থাকলেও তাঁর কাছে উৎসবের রং অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, প্রিয়জন হারানোর পর ঈদের দিনগুলো শুধু আনন্দের নয়, স্মৃতিরও হয়ে যায়।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, মাকে ছাড়া একের পর এক ঈদ কেটে যাচ্ছে। ঈদের দিন সকালে সেমাই রান্না করে খাওয়ানো, হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানানো—এসব ছোট ছোট স্মৃতিই এখন সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। তাঁর প্রার্থনা, মা যেন জান্নাতে শান্তিতে থাকেন।
প্রিয়জন হারানোর শোক কোনো উৎসবই মুছে দিতে পারে না। তবু মানুষ থেমে থাকে না। স্মৃতিকে বুকে নিয়ে, হারানো মানুষগুলোর জন্য দোয়া করে, জীবনকে নতুনভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন ঈদ শুধু উপস্থিত মানুষদের নিয়ে নয়, অনুপস্থিত প্রিয়জনদের স্মৃতিতেও বেঁচে থাকে। আনন্দের ভেতর বিষাদের এই নীরব সহাবস্থানই অনেকের জীবনের বাস্তবতা।
✍️ মন্তব্য লিখুন