স্বাস্থ্য ডেস্ক
ফুসফুসের সুস্থতা শুধু ধূমপান না করার ওপর নির্ভর করে না। ঘরের ভেতরের ধোঁয়া, বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান, অতিরিক্ত রাসায়নিকযুক্ত পরিষ্কারক ব্যবহার—দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাসও দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণ এখন বিশ্বের অন্যতম বড় পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি। ঘরের ভেতর ও বাইরের বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ অকালমৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য ও সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন ছয়টি দৈনন্দিন অভ্যাস হলো—
১. ধূমপান করা
ফুসফুসের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি ধূমপান। সিগারেটের ধোঁয়ায় হাজারো রাসায়নিক থাকে, যার অনেকগুলো বিষাক্ত এবং ক্যানসার সৃষ্টিকারী।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) বলছে, ফুসফুসের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সিগারেট ধূমপান। ধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া বা এতে মৃত্যুর ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় প্রায় ১৫ থেকে ৩০ গুণ বেশি হতে পারে। এমনকি প্রতিদিন অল্পসংখ্যক বা মাঝে মাঝে সিগারেট খেলেও ঝুঁকি বাড়ে।
ধূমপান দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শ্বাসনালিতে ক্ষতি, অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি এবং দীর্ঘস্থায়ী অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD)-এর ঝুঁকি বাড়ে।
২. অন্যের ধোঁয়া নিয়মিত শ্বাসে নেওয়া
নিজে ধূমপান না করলেও আশপাশের মানুষের সিগারেটের ধোঁয়া থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকা যায় না। একে বলা হয় পরোক্ষ ধূমপান বা secondhand smoke।
WHO বলছে, তামাকের ধোঁয়া—পরোক্ষ ধূমপানসহ—ফুসফুসের স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষতিকর প্রভাবগুলোর একটি। এটি অ্যাজমা, COPD, ফুসফুসের ক্যানসার, নিউমোনিয়া ও যক্ষ্মার মতো রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
CDC-ও বলছে, অন্যের তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা অধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ঘর ও গাড়িকে ধূমপানমুক্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. রান্নার ধোঁয়া ও অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল
রান্নাঘরে দীর্ঘসময় ধোঁয়ার মধ্যে থাকা অনেক পরিবারের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তৈরি সূক্ষ্ম কণা ও অন্যান্য দূষক ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।
WHO-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২১০ কোটি মানুষ এখনো কাঠ, কয়লা, কেরোসিন, ফসলের বর্জ্য বা অন্যান্য দূষিত জ্বালানি ব্যবহার করে রান্না করেন। ২০২১ সালে ঘরোয়া বায়ুদূষণের সঙ্গে প্রায় ২৯ লাখ অকালমৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এই দূষিত বাতাস শ্বাসনালি ও ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং COPD ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ঘরে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
৪. ধূপ, মশার কয়েল বা অন্যান্য ধোঁয়াযুক্ত উপাদান নিয়মিত পোড়ানো
ঘরের বাতাস দূষিত হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে ধূপ, আগরবাতি বা মশার কয়েলের ধোঁয়া। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখে দীর্ঘসময় এগুলো পোড়ালে ধোঁয়ার সূক্ষ্ম কণা ও অন্যান্য রাসায়নিক বাতাসে জমতে পারে।
WHO-এর বায়ুদূষণবিষয়ক নির্দেশনায় রান্নার ধোঁয়ার পাশাপাশি ধূপ ও মশার কয়েলকেও ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে মশার কয়েল ব্যবহারের সময় উৎপন্ন সূক্ষ্ম কণা ও উদ্বায়ী রাসায়নিক ঘরের বাতাসের মান খারাপ করতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে মশারি বা কম-ধোঁয়ার বিকল্প ব্যবহার এবং ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা ভালো।
৫. ঘন ঘন স্প্রে ও শক্তিশালী পরিষ্কারক ব্যবহার
ঘর পরিষ্কার রাখতে জীবাণুনাশক, এয়ার ফ্রেশনার, কাচ পরিষ্কার করার স্প্রে বা অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। তবে অতিরিক্ত বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে এসব পণ্যের নির্গত কণা ও উদ্বায়ী রাসায়নিক শ্বাসতন্ত্রে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গৃহস্থালির পরিষ্কারক ও জীবাণুনাশক ব্যবহারের সময় কণা ও volatile organic compounds (VOCs) নির্গত হতে পারে, যা শ্বাসতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আগের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাতেও দেখা গেছে, ঘন ঘন পরিষ্কারক স্প্রে ব্যবহারের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের নতুন করে অ্যাজমার উপসর্গ দেখা দেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
তাই পরিষ্কারক ব্যবহারের সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্যবহার, ঘরে বায়ু চলাচল রাখা এবং একাধিক রাসায়নিক একসঙ্গে না মেশানো জরুরি।
৬. বায়ুদূষণের মাত্রা উপেক্ষা করে দীর্ঘসময় বাইরে থাকা
শহরের ব্যস্ত সড়ক, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা ও সূক্ষ্ম কণার মধ্যে দীর্ঘসময় থাকা ফুসফুসের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
WHO বলছে, PM10-এর মতো ক্ষুদ্র কণা ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে শ্বাসনালিতে জ্বালা ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। আরও ছোট PM2.5 কণা ফুসফুসের বাধা অতিক্রম করে রক্তপ্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষ করে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকা দিনে দীর্ঘসময় ব্যস্ত সড়কে থাকা বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ব্যায়াম করার আগে স্থানীয় বায়ুমানের তথ্য বিবেচনা করা উচিত। WHO বলছে, দূষণের সংস্পর্শ কমানোর জন্য কখন, কোথায় এবং কী ধরনের বাইরে থাকার কার্যক্রম করা হচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ফুসফুস ভালো রাখতে কী করবেন?
ফুসফুসের ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে প্রথমেই ধূমপান বন্ধ করা এবং পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা জরুরি। রান্নার সময় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, সম্ভব হলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার, ঘরে অপ্রয়োজনীয় ধোঁয়া তৈরি না করা এবং রাসায়নিক পরিষ্কারক ব্যবহারে সতর্ক থাকা উচিত।
বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকলে বাইরে থাকার সময় ও কার্যক্রমও পরিকল্পনা করা যেতে পারে। WHO-এর মতে, দীর্ঘমেয়াদে দূষণের সংস্পর্শ কমানোই ফুসফুস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।
মনে রাখা দরকার: ফুসফুসের ক্ষতি অনেক সময় ধীরে ধীরে হয় এবং শুরুতে স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুক চাপ লাগা, শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ বা বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
✍️ মন্তব্য লিখুন