নেপালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনীতিতে দুটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—চীনঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের পুনরুত্থান নাকি ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়া নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের উত্থান।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন সুশীলা কার্কি। এরপর থেকেই দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবারও নির্বাচনের ফলাফলকে জটিল করে তুলতে পারে।
—
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা
১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে নেপালে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। গত তিন দশকে দেশটি প্রায় ৩২টি সরকার দেখেছে, কিন্তু কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনেও কোনো একক দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ভারতের মনোহর পারিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিস–এর গবেষক নীহার আর নায়েক বলেন, “নেপালে কোনো দলেরই এককভাবে সরকার গঠনের মতো শক্তিশালী অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।”
—
তরুণদের আন্দোলন থেকে নতুন নেতৃত্ব
গত বছরের ‘জেন জি’ আন্দোলনের পর জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ, যিনি ‘বালেন’ নামেও পরিচিত।
এক সময় তিনি র্যাপ শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন এবং তাঁর গানগুলোতে তরুণদের আশা-হতাশা ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয় উঠে এসেছে। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি তরুণ ভোটারদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তিনি এবার নির্বাচন করছেন ঝাপা–৫ আসনে, যা দীর্ঘদিন ধরে কেপি শর্মা ওলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
২০০৮ সালের নির্বাচন ছাড়া ১৯৯১ সাল থেকে টানা এই আসন থেকেই জয়ী হয়ে আসছেন ওলি। তবে এবার পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বালেন শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি–এর হয়ে, যা ২০২২ সালের নির্বাচনে চতুর্থ অবস্থানে ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে দলটির ফলাফল আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
—
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো
নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল), যার নেতৃত্বে রয়েছেন কেপি শর্মা ওলি।
এছাড়া শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে নেপালি কংগ্রেস, যেখানে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন গগন থাপা। এর আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা।
নির্বাচনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী কেন্দ্র), যার নেতৃত্বে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল, যিনি ‘প্রচণ্ড’ নামেও পরিচিত।
—
ভারত–চীন প্রভাবের প্রশ্ন
নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও চীনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওলি বা প্রচণ্ডের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে নেপাল সাধারণত চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে যায়। এ বিষয়ে মন্তব্য করে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়–এর অধ্যাপক এন. পি. সিং বলেন, “অলি বা প্রচণ্ডের সরকার এলে নেপাল প্রায়ই চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।”
তবে দিল্লি প্রকাশ্যে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করলেও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
—
ঝাপা–৫ আসনের দিকে নজর
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের ফল অনেকটাই নির্ভর করতে পারে ঝাপা–৫ আসনের ওপর।
স্থানীয় সাংবাদিক চিরঞ্জীবী ঘিমিরে জানিয়েছেন, আগের নির্বাচনে ওলি এই এলাকায় খুব কম প্রচার চালালেও এবার পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন তিনি প্রায় পুরো সময়ই এই আসনে প্রচারে ব্যস্ত।
অন্যদিকে বালেন শাহ ঝাপা–৫ বাদে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালিয়ে তরুণ ভোটারদের সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
—
ফলাফল অনিশ্চিত
নেপালের নেপাল নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনের পর ১৬৫টি আসনের ব্যালট বাক্স সংগ্রহের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যে দলই জিতুক না কেন, এককভাবে স্থিতিশীল সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে আবারও জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি।
তাদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়—এটি নেপালের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
✍️ মন্তব্য লিখুন