নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েই ব্যস্ত ছিল তার দিনগুলো। কিন্তু সেই সাধারণ শিক্ষার্থীই আজ দেশের কৃষিভিত্তিক কনটেন্ট জগতের পরিচিত মুখ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো অনুসারীর কাছে তিনি পরিচিত একজন অ্যাগ্রো-ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে। বলছিলাম উম্মে কুলসুম পপি-এর কথা।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই কৃষক, ফসল আর মাঠের জীবনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন তিনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে উপলব্ধি করেন, কৃষকের বাস্তব জীবন ও সংগ্রামের গল্প শহুরে মানুষের কাছে খুব কমই পৌঁছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সহপাঠী আবু সাঈদ আল সাগর-সহ কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে তিনি যুক্ত হন বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে। একটি স্বেচ্ছাসেবী ও সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে ভিডিও নির্মাণ, গ্রাফিক ডিজাইন, উপস্থাপনা এবং গল্প বলার দক্ষতা অর্জন করেন। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, এই দক্ষতাগুলোই একদিন তার পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠবে।
২০২২ সালে তিস্তা নদীর চর-এ কুমড়া চাষ নিয়ে ধারণ করা একটি ভিডিও তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কৃষকের জীবন ও কৃষিকাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর কৃষিকে ঘিরে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি শুরু করেন তিনি।
পপির ভিডিওগুলোতে শুধু চাষাবাদের কৌশল নয়, উঠে আসে কৃষকের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং সাফল্যের গল্প। কখনো তিনি জৈব কীটনাশক তৈরির পদ্ধতি তুলে ধরেন, কখনো নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন, আবার কখনো নতুন কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার দেখান। সহজ ভাষা ও আন্তরিক উপস্থাপনার কারণে তার কনটেন্ট দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছালেও মাঠের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছেন তিনি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে জীবনসঙ্গী আবু সাঈদ আল সাগরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছেন Premium Fruits Limited। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের নিরাপদ ফল ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পপির যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি কৃষিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরারও একটি উদাহরণ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তিনি প্রমাণ করেছেন, কৃষি শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি বাস্তবতা।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে কৃষি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি বিস্তার এবং কৃষকদের সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে দিতে পপির মতো কনটেন্ট নির্মাতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আর সেই যাত্রার শুরু হয়েছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের আগ্রহকে কাজে রূপ দেওয়ার সাহস পেয়েছিলেন।
তিস্তার চরের একটি সাধারণ ভিডিও থেকে শুরু হওয়া সেই পথচলা আজও অব্যাহত। আর প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে উঠছে মাটি, মানুষ ও কৃষির প্রতি এক তরুণীর গভীর ভালোবাসার গল্প।
✍️ মন্তব্য লিখুন