ডেস্ক নিউজ
ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলোচনার কেন্দ্রে ১৯৮০-এর দশকের ‘রেট্রো লুক’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বর্তমান সময়ের ছবি ৮০-এর দশকের পোশাক, চুলের স্টাইল ও পুরোনো দিনের ক্যামেরার আবহে রূপান্তরের এই ট্রেন্ডে এবার সরাসরি যুক্ত হয়েছেন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী কংগ্রেসের নেতারা। শুরুতে নিছক বিনোদনের এই প্রবণতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রসিকতা ও পাল্টাপাল্টি প্রচারের উপাদানে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই ট্রেন্ডে বিজেপির একাধিক নেতা ও মন্ত্রীকে ৮০-এর দশকের কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবিতে দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এআই-নির্মিত রেট্রো ছবি প্রকাশ করে ট্রেন্ডে অংশ নেন। বিজেপির অন্য নেতারাও একই ধরনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন।
কংগ্রেসও পিছিয়ে থাকেনি। দলটির সেবাদল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাহুল গান্ধীর ৮০-এর দশকের আদলে তৈরি ছবি প্রকাশ করেছে। তবে কংগ্রেসের সাংসদ শশী থারুর এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ বেছে নেন। এআই দিয়ে নতুন ছবি তৈরির বদলে তিনি ১৯৮০-এর দশকের নিজের ও তাঁর দুই সন্তানের একটি আসল পুরোনো ছবি প্রকাশ করেন। তাঁর এই পোস্টও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বিনোদন থেকে রাজনৈতিক বার্তা
এই প্রবণতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এটি কেবল ছবি বানানোর খেলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিজেপি ও কংগ্রেসের নেতাদের অংশগ্রহণের পর রেট্রো ছবিগুলোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মিম ও ব্যঙ্গাত্মক পাল্টাপাল্টি বার্তা। ফলে ৮০-এর দশকের নস্টালজিয়া এখন রাজনৈতিক যোগাযোগেরও একটি নতুন উপকরণ হয়ে উঠছে।
এআইয়ের সাহায্যে কয়েক মিনিটেই বর্তমানের কোনো ব্যক্তির ছবিকে পুরোনো দিনের পোশাক ও পরিবেশে রূপ দেওয়া যাচ্ছে। ফলে রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় থাকার কৌশলেও এ ধরনের প্রযুক্তি নতুন মাত্রা যোগ করছে।
৮০-এর দশকের রাজনীতিতে প্রযুক্তির আরেক গল্প
ভারতীয় রাজনীতিতে প্রযুক্তির সঙ্গে এই সম্পর্ক অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস দলীয় কর্মকাণ্ডে কম্পিউটার, তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, দলীয় সংগঠন ও নির্বাচনী কৌশলে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বিজেপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনী প্রচার ও ভোটার বিশ্লেষণে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি গ্রহণ করতে শুরু করে। ফলে আজকের এআই-নির্ভর রাজনৈতিক যোগাযোগকে সেই দীর্ঘ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনেরই নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা যায়।
নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর কৌশল
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মিম, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও এবং এআই-নির্মিত ছবি ব্যবহার করে নেতাদের তুলনামূলকভাবে হালকা ও ব্যক্তিগত একটি ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রবণতা বাড়ছে।
৮০-এর দশকের এই ট্রেন্ড সেই প্রবণতাকেই আরও দৃশ্যমান করেছে। একদিকে বিজেপির নেতারা এআই-নির্মিত রেট্রো ছবি দিয়ে অংশ নিচ্ছেন, অন্যদিকে কংগ্রেসও একই প্রবণতাকে রাজনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে বিনোদনমূলক একটি এআই ট্রেন্ড শেষ পর্যন্ত দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
তবে এ ধরনের এআই-নির্মিত ছবির ক্ষেত্রে কোনটি বাস্তব আর কোনটি কৃত্রিম—তা স্পষ্ট করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রচারে কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও ভিডিও ব্যবহারের সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এই দিক থেকে ৮০-এর দশকের রেট্রো এআই ট্রেন্ড শুধু নস্টালজিয়ার গল্প নয়; এটি দেখাচ্ছে, ভারতের রাজনীতিতে প্রযুক্তি কীভাবে বিনোদন, ভাবমূর্তি নির্মাণ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ—তিনটিকেই একইসঙ্গে প্রভাবিত করছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন