নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদলের পর সরকার পরিচালনা এবং দলীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিএনপির বহুদিনের ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে—সরকারের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জেলা, মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও দলীয় কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করতে গিয়ে সাংগঠনিক কাজে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তিদের হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকায় নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। এসব বিবেচনায় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের মডেলেই নতুন ভাবনা
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman দল ও সরকারের দায়িত্ব আলাদা রাখার একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর সময়ে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যরা সাধারণত জেলা সভাপতি বা সম্পাদক পদে থাকতেন না। পরে ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি গঠনতন্ত্রেও যুক্ত করা হয়।
দলটির সিনিয়র নেতাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় সেই নীতিকে আবার কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে সরকারে থাকা নেতারা প্রশাসনিক দায়িত্বে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন এবং সাংগঠনিক নেতৃত্বে নতুন মুখ উঠে আসবে।
আলোচনায় যেসব নাম
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে দায়িত্ব পালন করা অন্তত ছয়জন নেতা বর্তমানে সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক
ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য ও উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন
ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু
যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন
স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জিলানী
বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান
সূত্রগুলো বলছে, এসব ইউনিটে নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তুতিও চলছে।
জেলা পর্যায়েও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শুধু কেন্দ্র বা মহানগর নয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের অনেক প্রভাবশালী নেতাও বর্তমানে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যেও সাংগঠনিক পদ ছাড়ার আলোচনা চলছে।
এ তালিকায় রয়েছেন—
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
ত্রাণ ও দুর্যোগমন্ত্রী এবং লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি আসাদুল হাবীব দুলু
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও পঞ্চগড় জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ফরহাদ হোসেন আজাদ
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্যাহ
নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি ও দলের যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলসহ আরও অনেকে।
কী বলছেন বিএনপির নেতারা
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান Shamsuzzaman Dudu বলেছেন, দল ও সরকারের মধ্যে একটি কার্যকর পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, জিয়াউর রহমানের সময় যারা সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হতেন, তারা অনেক ক্ষেত্রেই সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দিতেন, যাতে নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বয়স খুব বেশি হয়নি। সামনে সরকার ও দলের কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের মাধ্যমে এগোবে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি কার্যকর হতে পারে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য কী
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই উদ্যোগ কেবল সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির কৌশলও। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতার অংশীদার হওয়া নেতাদের প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ততা বেড়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে দলকে সক্রিয় রাখতে নতুন সাংগঠনিক নেতৃত্ব প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
এছাড়া দলীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে সাংগঠনিক বিকেন্দ্রীকরণ ঘটানোর চেষ্টাও এতে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
✍️ মন্তব্য লিখুন