
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকা: ১৭ মে ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রচলিত ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি সম্পদ কিংবা সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ ছিল বৈশ্বিক শক্তির প্রধান মানদণ্ড, সেখানে এখন প্রযুক্তি, তথ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামো নতুন ক্ষমতার উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যকে কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছে China।
চীনের বৈশ্বিক অবকাঠামো উদ্যোগ Belt and Road Initiative–এর অংশ হিসেবে চালু হওয়া “ডিজিটাল সিল্ক রোড” এখন মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ৫জি নেটওয়ার্ক, স্মার্ট সিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং সাইবার অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে বেইজিং।
তেলনির্ভরতা থেকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ধীরে ধীরে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। Saudi Arabia–এর ‘ভিশন ২০৩০’, United Arab Emirates–এর স্মার্ট গভর্নমেন্ট উদ্যোগ, Qatar–এর প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং Iraq–এর পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ডিজিটাল আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চীন তাদের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে অঞ্চলটির বাজারে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে Huawei মধ্যপ্রাচ্যে ৫জি অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সৌদি আরব, ইউএই, ইরাক, কাতার, কুয়েত ও ওমানে হুয়াইয়ের প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক, স্মার্ট সিটি ও এআইভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ইরাকে বাড়ছে চীনের কৌশলগত উপস্থিতি
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অংশীদারদের একটি হয়ে উঠছে ইরাক। দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ডিজিটাল সরকারি সেবার বিস্তার ঘটছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো টেলিযোগাযোগ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল ব্যাংকিং, এআইভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। China Mobile International–এর সঙ্গে স্থানীয় অপারেটর এশিয়াসেলের ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ চুক্তি, হুয়াইয়ের সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন এআইভিত্তিক প্রযুক্তি প্রকল্প ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরাকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান গড়ে তুলছে বেইজিং।
ভবিষ্যতে ইরাক উপসাগরীয় অঞ্চল, Iran, Turkey এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল করিডরে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্মার্ট সিটি ও এআই প্রতিযোগিতায় চীনের অগ্রগতি
মধ্যপ্রাচ্যে স্মার্ট সিটি নির্মাণেও দ্রুত বাড়ছে চীনের প্রযুক্তিগত প্রভাব। সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ নগর প্রকল্প NEOM–এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, স্বয়ংক্রিয় পরিবহন এবং ডিজিটাল প্রশাসনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ইউএই ইতোমধ্যে বিমানবন্দর, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ ব্যবস্থা ও সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এসব প্রকল্পে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ অঞ্চলটিতে বেইজিংয়ের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করছে।
পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ
তবে চীনের “ডিজিটাল সিল্ক রোড” নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে পশ্চিমা বিশ্বে। United States ও তার মিত্রদের অভিযোগ, চীনা প্রযুক্তি অবকাঠামো নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হুয়াইকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
যদিও চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করছে, ডিজিটাল সিল্ক রোড মূলত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সংযোগ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ।
ডিজিটাল ভূরাজনীতির নতুন বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব এখন “ডিজিটাল ভূরাজনীতি”-র যুগে প্রবেশ করছে। আগে যেখানে সামরিক শক্তি বা জ্বালানি সম্পদ ছিল ক্ষমতার প্রতীক, সেখানে এখন ডেটা, সাইবার অবকাঠামো, ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠছে নতুন শক্তির উৎস।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ডিজিটাল সিল্ক রোড কার্যক্রম সেই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নতুন প্রতিযোগিতা আগামী দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
✍️ মন্তব্য লিখুন