প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৫ PM
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য ও সাম্প্রতিক আইনগত পরিবর্তন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে খোলা চিঠি দিয়েছেন সদ্যবিদায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন–এর পাঁচজন কমিশনার। ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই এই চিঠি লেখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী পাঁচ কমিশনার হলেন— বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, মো. নূর খান, অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, ইলিরা দেওয়ান এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস।
সংসদে দেওয়া তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
কমিশনাররা দাবি করেন, গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সম্পর্কিত অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পক্ষে সংসদে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কিছু তথ্য ভুল বা বিভ্রান্তিকর। তাদের মতে, গুম সংক্রান্ত আইনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত রয়েছে—যা সংসদে উত্থাপিত বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তারা আরও বলেন, তদন্তের সময়সীমা, জরিমানা নির্ধারণ ও আদায়ের বিধান—এসবই সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। বরং পুনর্বহাল করা ২০০৯ সালের আইনে এসব বিষয় অনুপস্থিত।
আইনি শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা
চিঠিতে কমিশনাররা সতর্ক করেন, গুম অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে ১১ এপ্রিলের পর সংঘটিত কোনো নতুন গুম ফৌজদারি আইনে সংজ্ঞায়িত না-ও হতে পারে। এতে ভুক্তভোগীরা প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
তারা উল্লেখ করেন, International Crimes Tribunal (আইসিটি) কেবল ব্যাপক বা পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার করতে পারে; বিচ্ছিন্ন গুমের বিচার এর আওতায় পড়ে না।
তদন্তে স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ
চিঠিতে বলা হয়, পুনর্বহালকৃত আইনে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে বাধা সৃষ্টি হয়েছে, যা কমিশনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
কমিশনারদের মতে, নতুন আইনের মাধ্যমে কমিশনকে কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—যা একটি স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের মূল চেতনার পরিপন্থী।
‘জুলাই আন্দোলন’ ও বিচার নিয়ে উদ্বেগ
চিঠিতে ‘জুলাই আন্দোলন’-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ নিয়েও মন্তব্য করা হয়। সেখানে বলা হয়, নতুন আইনে তদন্তের দায়িত্ব এমন সংস্থার ওপর বর্তাতে পারে, যারা নিজেরাই সংশ্লিষ্ট ঘটনার পক্ষ ছিল—ফলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার প্রসঙ্গ
কমিশনাররা স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশ International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance–এ স্বাক্ষর করেছে। ফলে গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার অংশ।
শক্তিশালী আইন প্রণয়নের আহ্বান
চিঠির শেষাংশে কমিশনাররা বলেন, ভবিষ্যতে নতুন আইন প্রণয়ন হলে সেটি যেন কার্যকর ও শক্তিশালী হয়, সে বিষয়েই নজর রাখা জরুরি। কেবল আশ্বাস নয়, বাস্তবসম্মত আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তারা লিখেছেন, “যে পরিবারগুলো এখনও প্রিয়জনের অপেক্ষায় দরজায় কান পেতে আছে, তাদের প্রশ্নের জবাব কথায় নয়—শক্তিশালী আইনের মাধ্যমেই দিতে হবে।”
✍️ মন্তব্য লিখুন