ঢাকা, ২৮ মে: পবিত্র ঈদুল আজহার দিন সাধারণত পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও আনন্দঘন পরিবেশে কাটানোর কথা। কিন্তু দেশের অনুদানভুক্ত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শতাধিক শিক্ষক এবার ঈদের আনন্দ ত্যাগ করে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। তাদের একটাই দাবি—দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং দ্রুত এমপিওভুক্তি।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় অবস্থান নেন শিক্ষকরা। আন্দোলনকারীরা জানান, এটি কোনো আকস্মিক কর্মসূচি নয়; গত আট দিন ধরে তারা ধারাবাহিকভাবে একই স্থানে অবস্থান করছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় ঈদের দিনেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা সরকারি স্বীকৃতি ও বেতন কাঠামোর বাইরে রয়েছেন। ফলে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঈদের মতো উৎসবের সময়ও পরিবারের জন্য ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না তারা।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এক শিক্ষক আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ঈদ আনন্দের উৎসব হলেও তাদের জীবনে সেই আনন্দ নেই। বেতন-ভাতা না পাওয়ায় সন্তানদের নতুন পোশাক কিনে দেওয়া, ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা কিংবা কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্যও তাদের নেই। অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার খরচ জোগাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। এমন পরিস্থিতিতে পরিবার ছেড়ে রাজপথে ঈদ কাটানো তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের হলেও দাবি আদায়ের স্বার্থে এ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
আরেক শিক্ষক জানান, বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশার মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার নেই। সন্তানেরা নতুন পোশাক ও ঈদের উপহারের অপেক্ষায় থাকলেও তিনি তা দিতে পারছেন না। তাই ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান আদায়ের লক্ষ্যকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
এর আগে গত রোববার এমপিওভুক্তির দাবিতে সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে পদযাত্রা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে শিক্ষক নেতারা বৈঠক করে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত দেশের সব স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা এবং ঈদকালেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
অনুদানভুক্ত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক কল্যাণ কমিটির সদস্য সচিব আব্দুল হান্নান হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্তির বিষয়ে যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণাও বহাল থাকবে।
তিনি আরও জানান, ঈদের দিন প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সেই সুযোগে শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরতে চান। এ লক্ষ্যে তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের উদ্দেশ্যে পদযাত্রারও পরিকল্পনা করেছেন।
শিক্ষকদের এই আন্দোলন দেশের শিক্ষা খাতের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হাজারো শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাদের দাবি দ্রুত সমাধান না হলে শিক্ষা কার্যক্রমের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ঈদের দিনে যখন দেশের অধিকাংশ মানুষ উৎসব উদযাপনে ব্যস্ত, তখন রাজধানীর রাজপথে বসে থাকা এসব শিক্ষকের মুখে ফুটে উঠেছে এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র—যেখানে উৎসবের আনন্দকে ছাপিয়ে গেছে জীবিকার নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।
✍️ মন্তব্য লিখুন