বাংলাদেশ ব্যাংকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বা মবচাপের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির দেশের ইতিহাসে কার্যত একবারই দেখা গেছে। ঘটনাটি ২০০৩ সালের, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ।
২০০৩: গভর্নর অবরুদ্ধ, এরপরই কঠোর শাস্তি
২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর পদোন্নতির দাবিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। অভিযোগ রয়েছে, সরকার-সমর্থিত কর্মচারী সংগঠনের নেতৃত্বে ৪০০-৫০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিক্ষোভে অংশ নেন এবং গভর্নরকে প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।
বিক্ষোভকারীরা একদিনের মধ্যে ১০০ জন কর্মকর্তাকে সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতির দাবি জানিয়ে স্লোগান ও উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ করেন। একপর্যায়ে কয়েকজন জোর করে গভর্নরের কক্ষেও প্রবেশ করেন।
ঘটনার মাত্র দুই দিন পর, ৩০ অক্টোবর, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় জড়িত ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তাদের মধ্যে কর্মচারী সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও ছিলেন। পরবর্তীতে তারা চাকরি ফিরে পাননি—যা প্রশাসনিক কঠোরতার একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
তৎকালীন রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও গভর্নর কঠোর অবস্থানে অটল ছিলেন এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের সমর্থনও পান বলে জানা যায়।
১৯৯৬: গভর্নর ঘেরাওয়ের আরেক বিতর্কিত অধ্যায়
বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরকে ঘেরাও করার ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে সদ্য ক্ষমতাসীন সরকারের সময় গভর্নর ছিলেন খোরশেদ আলম, যিনি আগের সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন।
তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২১ নভেম্বর নিয়োগ বাতিল করা হয় এবং একই দিনে নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পান লুৎফর রহমান সরকার।
সমসাময়িক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওই দিন সকাল থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ খোরশেদ আলমকে ঘেরাও করে রাখেন এবং স্লোগান দেন। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিতে এলে সাবেক গভর্নর তখনও কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। পরে অনুরোধের পর তাকে নিরাপদে অফিস ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়।
২০০৯: বিদায়ী গভর্নরকে ঘিরে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ
২০০৯ সালে দায়িত্বের শেষ দিনে তৎকালীন গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ-কেও উচ্ছৃঙ্খল আচরণের মুখে পড়তে হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
বিদায়ী মুহূর্তে ইনক্রিমেন্ট দাবিকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ গভর্নরের কক্ষে অবস্থান নেয় এবং দাবি আদায়ের চেষ্টা চালায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি বিকল্প গেট দিয়ে ব্যাংক ত্যাগ করেন।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও পুনরায় আলোচনায় ‘মব কালচার’
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে ঘিরে আবারও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর অতীতের ঘটনাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে গভর্নরের উপদেষ্টাকে ঘিরে উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে মবচাপের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালের ঘটনার মতো দ্রুত ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া প্রতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ ওই একবার ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ঘটনায় দৃশ্যমান শাস্তির উদাহরণ কার্যত নেই বললেই চলে।
ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, পেশাগত শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন