প্রাণ কুমার রায়| প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রাত ২১:২১ | আপডেট: —
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বক্তব্যে পরিবর্তন এনে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। শপথ গ্রহণের পর তার দেওয়া বক্তব্যে নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ভিন্ন মাত্রার বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে মূল্যায়ন আসতে শুরু করেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এবারের নির্বাচন মোটামুটি গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। তার মতে, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তবে দলটির অনেক নেতাকর্মী স্থানীয় পর্যায়ে স্বতন্ত্র বা অন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভোটের প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন, যা ভোটার অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এই মূল্যায়নের বিপরীতে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। শপথের পর তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ফলে দেশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সংসদে প্রতিফলিত হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন সংসদে অনুপস্থিত থাকতে পারে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীত সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি যেমন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, তেমনি বর্তমান সংসদে বড় একটি রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। রুমিন ফারহানা অতীত সংসদের উদাহরণ টেনে বলেন, একসময় বিএনপি সংসদের বাইরে ছিল, আর এবার আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী দলগুলোর অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির আলোচনাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত থাকায় দলটি এবারের নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এ সিদ্ধান্ত নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৯৭টির গেজেট প্রকাশ হয়েছে; বাকি দুটি আসনের ফল আদালতের রায়ের ওপর নির্ভরশীল। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৯.৪০ শতাংশ এবং গণভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল ৬০.২৬ শতাংশ।
দলভিত্তিক ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা ২০৯টি আসন অর্জন করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তাদের প্রাপ্ত আসন ৬৮টি। এছাড়া এনসিপি পেয়েছে ৬টি আসন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও গণঅধিকার পরিষদ একটি করে আসন লাভ করেছে। অপরদিকে জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি রাজনৈতিক দল কোনো আসন পায়নি।
সামগ্রিকভাবে নির্বাচনকে ঘিরে দ্বিমুখী মূল্যায়ন সামনে আসছে—একদিকে প্রক্রিয়াগত গ্রহণযোগ্যতার দাবি, অন্যদিকে প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি নিয়ে বিতর্ক। রুমিন ফারহানার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তার অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যৎ সংসদীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
✍️ মন্তব্য লিখুন