দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের মিত্ররা। প্রায় দুই দশক পর দলটির রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতার সূচনা করেছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেমন উচ্চ, তেমনি শাসনব্যবস্থার শুরুতেই সামনে এসেছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ—অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে দ্রুত নীতিগত ও কার্যকর পদক্ষেপের সমন্বয় করতে না পারলে জনপ্রিয়তায় দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
দুর্নীতিমুক্ত ও স্বস্তির রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা নতুন সরকারের কাছে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তিময় জীবনযাপনের নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করছেন। তাদের প্রধান দাবি—দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও হয়রানিমুক্ত প্রশাসন এবং আইনের শাসনের কার্যকর প্রতিষ্ঠা।
সাধারণ নাগরিকদের মতে, একটি জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামো, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং নিরপেক্ষ বিচারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
অর্থনীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে চাপ
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের সামনে অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। সামনে রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণও সরকারের জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমন্বিত নীতি গ্রহণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় নতুন সরকারকে শুধু নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
আইনশৃঙ্খলা ও তৃণমূল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা নতুন সরকারের প্রথম দিককার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, অর্থ পাচার রোধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা গেলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাবে।
তথ্যবিভ্রাট ও নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা
গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন, গুজব ও তথ্যবিভ্রাট বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের বড় প্রতিবন্ধকতা। সঠিক ও দ্রুত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে নীতি বাস্তবায়নে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
শিক্ষা, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান—গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার
শিক্ষার্থীরা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী মহল জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা, শিল্পবান্ধব নীতি এবং বিনিয়োগ নিরাপত্তার ওপর জোর দিচ্ছেন। পাশাপাশি যুবসমাজের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিও জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
উচ্চ প্রত্যাশা—শক্তি নাকি ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত বেশি, যা একদিকে রাজনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে বড় চ্যালেঞ্জও। দৃশ্যমান সংস্কার, অংশগ্রহণমূলক শাসন এবং কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রত্যাশার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সার্বিকভাবে, রাজনৈতিক পালাবদলের এই সময়ে বাংলাদেশ নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার সমান্তরাল বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা—দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন সরকার দ্রুত কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেবে।
✍️ মন্তব্য লিখুন