আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হতে দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আরব দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সোমবার (২ নভেম্বর) বেইজিংয়ে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক আল-সাঈদের সঙ্গে বৈঠকে শি জিনপিং এসব কথা বলেন। ওমানের রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে দুই দিনের সফরে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন সুলতান হাইথাম।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল পরাশক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হওয়া উচিত নয়। এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, চীন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বন্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ অঞ্চলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংকট নিরসনে নিজেদের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমাধানের প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত বেইজিং। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদসহ (জিসিসি) আরব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় আরও জোরদার করতে চায় চীন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের এ বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহনব্যয় ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে।
গত সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে বিশেষ দূত পাঠাবে বেইজিং। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসে চীনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত ঝাই জুনের ইরান, ওমান ও সৌদি আরব সফরের কথা রয়েছে।
ওমান-চীন সম্পর্ক জোরদারে আলোচনা
বৈঠকে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক বলেন, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রগুলোর সমৃদ্ধির জন্য নিরাপত্তা, শান্তি, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা জরুরি। বিরোধ নিষ্পত্তিতে সামরিক শক্তির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এ ছাড়া চীনের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করেন ওমানের সুলতান। তাঁর মতে, এ ধরনের চুক্তি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
১৯৭৮ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এটিই কোনো ওমানি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম চীন সফর। বর্তমানে চীন ওমানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। জ্বালানি, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক ভূমিকা
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকটে তুলনামূলকভাবে সীমিত ভূমিকা পালন করে আসছে চীন। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর প্রভাবের কারণে অঞ্চলটিতে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে দেশটি। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চীনের অর্থনীতি ছাড়াও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে চীন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত। শি জিনপিংয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বেইজিং এ অঞ্চলে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে সংলাপ, সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিতে চায়।
✍️ মন্তব্য লিখুন