নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা | ২ নভেম্বর ২০২৬
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি, সহিংসতা কিংবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে ব্যবহার করে কোনো মহল ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে তা বরদাশত করা হবে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন—বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে একটি মহলের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এসব ঘটনায় কয়েকজন শিল্পমালিক ও শ্রমিক সংগঠনের কিছু নেতার সম্পৃক্ততার তথ্যও সরকারের কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাঁদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিওসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
গঠিত হয়েছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড
শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতি তিন বছর অন্তর শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। মালিকপক্ষ আগেই তাদের প্রতিনিধির নাম জমা দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি মনোনয়ন দিতে কিছুটা সময় লেগেছে। পরে উভয় পক্ষের প্রতিনিধির নাম পাওয়ার পর রোববার (১ নভেম্বর) শ্রম মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বোর্ড গঠন করে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সোমবারই বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তা সম্ভব না হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সভা করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন। মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের মতামত এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এবং শ্রমিকদের দাবিদাওয়া শোনার জন্য সোমবার বিকেল তিনটায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে গাজীপুর ও কালিয়াকৈর এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানা রোববার এক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। সোমবার সেগুলোর কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। যেসব কারখানা এখনো বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকার কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ হোক কিংবা শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারান, তা চায় না। শিল্পের পরিবেশ, বিনিয়োগ এবং শ্রমিকদের জীবিকা—সবকিছু বিবেচনায় রেখে সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রেক্ষাপট: শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হলো।
✍️ মন্তব্য লিখুন