নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ও সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং রপ্তানি কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
রোববার (১ নভেম্বর) রাতে সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে শ্রমিকদের দাবি, মজুরি পুনর্নির্ধারণ, শিল্পকারখানার নিরাপত্তা এবং রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মজুরি বোর্ডকে তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়, পারিবারিক প্রয়োজন এবং আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ। এ জন্য মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে শিল্পের উৎপাদনব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে হবে।
শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে বোর্ড গঠন
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এ বোর্ড আলোচনার মাধ্যমে নতুন মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতি তিন বছর অন্তর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সরকার আগেভাগেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন। বাড়িভাড়া, খাদ্য, যাতায়াত ও চিকিৎসাব্যয় বৃদ্ধিকে তাঁরা এ দাবির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
সহিংসতা এড়িয়ে আলোচনার আহ্বান
শ্রমিকদের দাবি আদায়ে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি মালিক ও শ্রমিকপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের নামে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, যানবাহন ভাঙচুর, কারখানায় অগ্নিসংযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহিংসতা ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রকৃত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
কারখানা চালু রাখা ও রপ্তানি কার্যক্রমে গুরুত্ব
আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো দ্রুত চালুর বিষয়ে মালিকপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে সরকার। মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ, রপ্তানি আদেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনা এবং শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন এখন নির্ভর করছে মালিক-শ্রমিকের কার্যকর সংলাপ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর।
✍️ মন্তব্য লিখুন