নিজস্ব প্রতিবেদক
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশের তিনটি গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সংঘর্ষের মধ্যে এক বিজিবি সদস্য ও কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ ও চন্দ্রা এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, বেলা ১১টার দিকে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্যোগ নিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এরপর দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা পুলিশের একাধিক গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব মিলিয়ে পুলিশের তিনটি গাড়ি হামলার শিকার হয়েছে।
সংঘর্ষের সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সময় টেলিভিশনের একজন প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসন। তাঁদের ব্যবহৃত ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া এসএ টেলিভিশনের এক ক্যামেরাপারসন পায়ে আঘাত পেয়েছেন বলে জানা গেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর এমন হামলার ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুরের দেড় শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মস্থলে যেতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েছেন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশাপাশি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানেও বিক্ষোভ ও অবরোধের খবর পাওয়া গেছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি, জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও শিল্প পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
শ্রমিকদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। শ্রমিকদের ভাষ্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাঁদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে সহিংসতা, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
শিল্পাঞ্চলের এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ এবং শ্রমিক-সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
✍️ মন্তব্য লিখুন