রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬
দীর্ঘ দুই থেকে প্রায় তিন দশক ধরে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও এখনো চাকরি নিয়মিত হয়নি Board of Intermediate and Secondary Education, Rajshahi-এর ৬৬ কর্মীর। আদালতের নির্দেশনা, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং বোর্ড সভায় অনুমোদনের পরও শেষ মুহূর্তে তা আটকে যাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও একটি প্রভাবশালী চক্রের কারণে তাঁদের নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই গত শনিবার মনিরুল ইসলাম দুলাল নামে এক শ্রমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সহকর্মীদের দাবি, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও চাকরি নিয়মিত না হওয়ার মানসিক চাপই তাঁর মৃত্যুর কারণ।
দুই–তিন দশকের চাকরি, তবু অস্থায়ী
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে ৬৬ জন নিয়োগ পান। তাঁদের পদ চতুর্থ শ্রেণির এমএলএসএস (মেসেঞ্জার/সহায়ক কর্মী)। বর্তমানে তাঁদের দৈনিক মজুরি ৭৫০ টাকা।
এর আগে বোর্ডে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া ৩৮ জন কর্মী আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে চাকরি নিয়মিত করতে সক্ষম হন। একই পথ অনুসরণ করে ২০১৪ সালে এই ৬৬ শ্রমিকও আদালতের শরণাপন্ন হন।
আদালতের নির্দেশনা
২০১৪ সালে High Court Division of the Supreme Court of Bangladesh ৯০ দিনের মধ্যে তাঁদের চাকরি নিয়মিত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বোর্ড কর্তৃপক্ষ সেই আদেশ বাস্তবায়ন না করে আপিল করে।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে Appellate Division of the Supreme Court of Bangladesh রায়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেন এবং মানবিক কারণে এই শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
নতুন উদ্যোগ ও অনুমোদন
দীর্ঘ সময় কোনো নিয়োগ না হলেও পরে বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক A. N. M. Mofakkharul Islam। তাঁর কাছে শ্রমিকরা বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি চাকরি নিয়মিত করার উদ্যোগ নেন।
চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং একটি বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ১৯ ও ২০ জানুয়ারি শ্রমিকদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর তাঁদের চাকরি নিয়মিত করার সিদ্ধান্ত হয় এবং ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় তা অনুমোদন পায়।
পরবর্তীতে ১৫ ফেব্রুয়ারি বোর্ডের সচিব অধ্যাপক Shamim Ara Chowdhury-এর কাছে শ্রমিকেরা যোগদানপত্র জমা দেন।
শেষ মুহূর্তে প্রক্রিয়া আটকে যায়
শ্রমিকদের অভিযোগ, যোগদানপত্র দেওয়ার সময় তাঁদের জানানো হয়েছিল মাসের অর্ধেক সময় আগের নিয়মে দৈনিক মজুরিতে এবং বাকি অর্ধেক সময় নিয়মিত কর্মচারী হিসেবে বেতন পাবেন। কিন্তু মাস শেষে দেখা যায়, পুরো মাসের পারিশ্রমিক আগের মতোই মজুরিভিত্তিক হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক মোসাদ্দেক হোসেন জনি বলেন,
“আমরা বহু বছর ধরে সামান্য মজুরিতে কাজ করছি। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও বোর্ড আমাদের চাকরি নিয়মিত করেনি। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও একটি দুষ্টচক্রের কারণে আমাদের নিয়োগ আটকে গেছে।”
আরেক শ্রমিক জাকারিয়া নয়ন বলেন,
“বোর্ড সভায় অনুমোদনের পর সচিব আমাদের যোগদানপত্রও নিয়েছেন। এরপরও চাকরি নিয়মিত হয়নি। এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমাদের সহকর্মী মনিরুল ইসলাম দুলাল স্ট্রোকে মারা গেছেন।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে বোর্ডের সচিব অধ্যাপক শামীম আরা চৌধুরী বলেন, শ্রমিকেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে যোগদানপত্র দিয়েছেন, তবে বর্তমানে তাঁদের চাকরি নিয়মিত করা হচ্ছে না।
অন্যদিকে বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোফাখখারুল ইসলাম বলেন,
“কিছু জটিলতা রয়েছে। মানবিক কারণে তাঁদের চাকরি নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো তা সম্ভব হচ্ছে না।”
অনিশ্চয়তায় শ্রমিকেরা
দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরও চাকরি নিয়মিত না হওয়ায় শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তাঁদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা ও বোর্ড সভার অনুমোদন অনুযায়ী দ্রুত নিয়োগ কার্যকর করা হোক।
✍️ মন্তব্য লিখুন