নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় বদলির আদেশ জারি হওয়ার প্রায় ১৬ মাস পরও কর্মস্থল ছাড়েননি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মুহাম্মদ নূরুল হুদা খান। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জানা গেছে, হাওরবেষ্টিত মদন উপজেলার প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র চিকিৎসা ভরসা মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন ডা. নূরুল হুদা খান।
এরপর ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে বান্দরবানে সহকারী সার্জন হিসেবে বদলি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ অমান্য করলে ষষ্ঠ কর্মদিবস থেকে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করার কথাও উল্লেখ ছিল।
তবে বাস্তবে দেখা গেছে, আদেশ জারির দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই দায়িত্ব পালন করছেন এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
অনিয়ম ও অনুপস্থিতির অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ, ডা. নূরুল হুদা খান নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন তিনি হাসপাতালে থাকেন, বাকি সময় বাইরে অবস্থান করেন। এতে করে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই হাসপাতালের সেবার মান অবনতির দিকে গেছে। প্রয়োজনীয় তদারকি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে দীর্ঘদিন ধরে নিজ অবস্থান ধরে রেখেছেন। এছাড়া অতীতে সরকারি গাড়ি অনুমতি ছাড়া অন্যত্র ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালে এ বিষয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে এখন পর্যন্ত সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ডা. নূরুল হুদা খান বিসিএস কর্মকর্তা নন, বরং এডহক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। কিন্তু তিনি নিজেকে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার ভিজিটিং কার্ডেও বিসিএস পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া তিনি কেন্দুয়া ও ঢাকায় বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসনের নীরবতা
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বদলির আদেশ অমান্য করে কীভাবে একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন দায়িত্বে বহাল থাকছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষণ:
প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে বহাল থাকা শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, এটি সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা জনসেবায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এখন নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকে—তারা কীভাবে এই অনিয়মের সমাধান করেন।
✍️ মন্তব্য লিখুন