স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা | প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদারে বড় পরিসরের একটি যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা করেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বৈঠকে ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণ, কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন, শিল্পখাতের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং স্মার্ট শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়।
ভাষা শিক্ষায় বিস্তৃত পরিকল্পনা
বৈঠকে জানানো হয়, দেশে ধাপে ধাপে চীনা ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রম চালু রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-এর সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের মাধ্যমে। চলতি বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এও চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত জানান, ভাষা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মুক্ত হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে কার্যরত প্রায় এক হাজার চীনা কোম্পানিতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে, যা পূরণে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভাষা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে অন্তত ১৭টি দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কারিগরি ও পলিটেকনিক শিক্ষায় আধুনিকায়ন
বৈঠকে কারিগরি ও পলিটেকনিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বাংলাদেশ ও চীন যৌথভাবে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহ পরিদর্শন করে কারিকুলাম আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স কাঠামো পুনর্বিন্যাসে কাজ করবে।
মন্ত্রী জানান, শিল্পখাতের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তোলা হলে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ ও প্রযুক্তি অবকাঠামো
চীনা ভাষা শিক্ষার প্রসারে প্রাথমিকভাবে ৩০০টি স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুটি করে শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের মাধ্যমে মোট ১৫০টি প্রতিষ্ঠানে এই সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৯টি ব্রডকাস্টিং সেন্টার স্থাপন, ভাষা ল্যাব উন্নয়ন এবং আধুনিক সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সরবরাহের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি পাইলট প্রকল্প চালু রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও স্টাডি ট্যুর
চীনা পক্ষ জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকা, কম্বোডিয়া ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশে তারা ভাষা ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণে সফলভাবে কাজ করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশেও একটি টেকসই দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলকে চীনে স্টাডি ট্যুরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যাতে তারা প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ সরেজমিনে পরিদর্শন করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
অবকাঠামো ও বৃত্তি সহায়তা
বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ ছাত্রীদের জন্য একটি আধুনিক হল নির্মাণে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভাব্য স্কলারশিপ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে যৌথভাবে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছে চীনা পক্ষ।
সরকার আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষা পরিকল্পনা ও চাহিদাপত্র চীনা পক্ষের কাছে উপস্থাপন করবে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে।
দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্ব
শিক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে এবং দেশের যুবসমাজ আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি দক্ষতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হলে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
✍️ মন্তব্য লিখুন