ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২ মার্চ ২০২৬
ফরিদপুরে জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় মৎস্যজীবীদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রতি ১৬০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক কার্ডধারী মৎস্যজীবীর হাতে পৌঁছেছে মাত্র ৬০ কেজি। কোথাও কোথাও বস্তাপ্রতি ওজনেও কম দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতি বছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই সময় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবী পরিবারকে সহায়তা দিতে সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চাল বরাদ্দ দেয়। চলতি বছরে ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই চার মাসে কার্ডধারী প্রতিটি মৎস্যজীবী পরিবারকে ১৬০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ফরিদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সেই চালের পুরো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ৬০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
বিভিন্ন ইউনিয়নে চাল বিতরণ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় কার্ডধারী মৎস্যজীবীদের নামে চাল বরাদ্দ এসেছে। এর মধ্যে নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নে ২৭০ জন, চরমাধবদিয়া ইউনিয়নে ১৩০ জন, ডিক্রিরচর ইউনিয়নে ১১৩ জন, আলিয়াবাদ ইউনিয়নে ৮৬ জন এবং ফরিদপুর পৌরসভায় ১০০ জন মৎস্যজীবীর নামে চাল বরাদ্দ করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার একজন প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে এই চাল বিতরণ হওয়ার কথা। তবে কয়েকটি স্থানে চাল বিতরণের সময় মৎস্য কর্মকর্তার কোনো প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিতরণে দেখা গেছে গড়মিল
গত রোববার (৮ মার্চ) চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণের সময় দেখা যায়, পুরোনো কার্ডধারীদের মাঝে ৩০ কেজির দুটি বস্তা মিলিয়ে ৬০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। নতুন কার্ডধারীদের ক্ষেত্রে কোথাও এক বস্তা, আবার কোথাও দুই বস্তা করে চাল দেওয়া হয়েছে।
এ সময় অনেক বস্তা কাটাছেঁড়া অবস্থায় ছিল। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন নতুন কার্ডধারী মৎস্যজীবীকে দ্রুত দুই বস্তা করে চাল দেওয়ার ঘটনাও দেখা যায়।
মৎস্যজীবীদের অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মৎস্যজীবী বলেন, তাদের অনেকেই জানেন না প্রকৃতপক্ষে কত কেজি চাল পাওয়ার কথা। তারা জানান, “আমাদের ৬০ কেজি করে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও তার চেয়েও কম। শুনেছি ১৬০ কেজি পাওয়ার কথা, কিন্তু সেটা দেওয়া হচ্ছে না।”
তাদের অভিযোগ, অভিযোগ করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। অভিযোগ করলে কার্ড বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
একজন মৎস্যজীবী বলেন,
> “আট মাস জাটকা ধরা বন্ধ থাকে। এই সময় সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। সরকার চার মাসের চাল দেয় বললেও বাস্তবে তার অনেক কম পাচ্ছি।”
বরাদ্দ ও বিতরণে অসঙ্গতি
সদর উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর সদর উপজেলায় মোট ১,৪০০ জন কার্ডধারী মৎস্যজীবী রয়েছেন। তবে চালের বরাদ্দ এসেছে ৬৫৩ জনের জন্য।
মোট বরাদ্দকৃত চালের পরিমাণ ১০৪ দশমিক ৪৮ মেট্রিক টন। কিন্তু যদি জনপ্রতি মাত্র ৬০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়, তাহলে প্রায় ৬৫ দশমিক ৩ মেট্রিক টন চালের হিসাবে গড়মিল দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য
চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তুহিনুর রহমান মণ্ডল খোকন বলেন,
কার্ডধারী মৎস্যজীবীর সংখ্যা বেশি হলেও চালের বরাদ্দ তুলনামূলক কম এসেছে। তাই সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে জনপ্রতি আপাতত ৬০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং চালের ওজন সঠিকভাবেই দেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য
ফরিদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোছা. শিরীন শারমিন খান বলেন, উপজেলায় মোট ১,৪০০ জন কার্ডধারী মৎস্যজীবী থাকলেও বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৬৫৩ জনের জন্য। মানবিক দিক বিবেচনায় চেয়ারম্যানরা সেই চাল সবার মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, চাল বিতরণে অনিয়ম বা ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন।
তার ভাষ্য, চাল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আসে এবং বরাদ্দ অনুযায়ীই তা ইউনিয়ন পরিষদে হস্তান্তর করা হয়।
জাটকা সংরক্ষণ ও ভিজিএফ কর্মসূচি
জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। এই সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারকে সহায়তা দিতে সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা দেয়। তবে মাঠপর্যায়ে বরাদ্দ কম আসা ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
✍️ মন্তব্য লিখুন