১১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। যদিও পরে কিছুটা কমে এসেছে, তবুও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় দাম এখনো অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামের এই ওঠানামা শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতি, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
—
জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট
বর্তমান পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব এখনো জ্বালানি সরবরাহের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর কতটা নির্ভরশীল। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেল পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু তেল উৎপাদনকারী দেশ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী—
ইরাকে তেল উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে
কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে
কাতারের একটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে
এর ফলে বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হুমকির মুখে পড়েছে।
—
দাম বাড়লে কী হয়?
জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর। এর ফলে—
পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে
শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়
বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে
শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়
বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ এবং জ্বালানি রেশনিং চালু করার মতো পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
—
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যদি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে পৌঁছায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৪ শতাংশ কমে যেতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ১৫০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
—
প্রযুক্তি, কৃষি ও শিল্প খাতে প্রভাব
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু তেল বা গ্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিভিন্ন শিল্পখাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
চিপ উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিতে পারে
স্মার্টফোন ও গাড়ি শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে
সার উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে
কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়তে পারে
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার উৎপাদনের উপাদান ইউরিয়া ও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত ধাতব উপকরণ সরবরাহ হয়। সরবরাহ কমে গেলে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
—
রাজনৈতিক চাপ ও বাজার অস্থিরতা
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ—
জাপানের শেয়ারবাজার সূচক প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে
দক্ষিণ কোরিয়ায় কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ
জার্মানির ডিএএক্স সূচক কমেছে ৭ শতাংশের বেশি
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে কম প্রভাব পড়লেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সেখানে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, কারণ এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।
—
কেন তেলের দাম এত গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ববাজারে তেলের দাম গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—
1. বিশ্ব অর্থনীতির বড় অংশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল
2. পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের মূল শক্তি হলো তেল ও গ্যাস
3. জ্বালানির দাম বাড়লে প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ে
4. জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিশ্ব অর্থনীতি এখনো জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে অনুভূত হবে।
✍️ মন্তব্য লিখুন