নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০৪
দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক এক বৈপরীত্যপূর্ণ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্কুল পর্যায়ে যেখানে মেয়েদের আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে ছেলেদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে আঁচল ফাউন্ডেশন।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর হার ৬১.৮ শতাংশ, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
স্কুল পর্যায়ে তিনগুণ বেশি মেয়ে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে (স্কুল পর্যায়) ২০২৫ সালে মোট ১৯০ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এর মধ্যে ১৩৯ জনই নারী শিক্ষার্থী এবং ৫১ জন পুরুষ। অর্থাৎ, এই স্তরে ছেলেদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন এবং আবেগীয় সংকটে তুলনামূলকভাবে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একাডেমিক চাপজনিত আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর ৭০.৮৩ শতাংশই নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এছাড়া পরিবারের ওপর অভিমান স্কুল পর্যায়ের আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, যা মোট ঘটনার ৩২.৬১ শতাংশের জন্য দায়ী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন চিত্র, এগিয়ে ছেলেরা
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চিত্রটি ভিন্ন। এই স্তরে ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করেছে মোট ৭৭ জন শিক্ষার্থী, যার মধ্যে ৪১ জন ছেলে এবং ৩৬ জন মেয়ে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আত্মহননকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৯.১ শতাংশই পুরুষ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে সেশনজট, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান সংকট এবং আত্মপরিচয়ের সংকট ছেলেদের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। এর ফলে হতাশা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
হতাশা ও সম্পর্কজনিত কারণ প্রাধান্য
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হতাশা ৩৬.৩৬ শতাংশ এবং প্রেমঘটিত কারণ ২৯.৫৪ শতাংশ ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হতাশাজনিত আত্মহত্যার হার আরও বেশি, প্রায় ৪৭.০৫ শতাংশ।
শিক্ষার স্তরভেদে কারণের ভিন্নতাও স্পষ্ট হয়েছে। স্কুল পর্যায়ে আবেগীয় অস্থিরতা, পারিবারিক চাপ ও একাডেমিক উদ্বেগ বড় ভূমিকা রাখলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ শিক্ষাজীবন এবং সামাজিক প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
করণীয় নিয়ে সুপারিশ
এই জেন্ডারভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেদনে কয়েকটি জরুরি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং চালু করা
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং জোরদার করা
সেশনজট নিরসনে কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ
কিশোরীদের আবেগীয় সংকট মোকাবিলায় শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাইকো-সোশ্যাল প্রশিক্ষণ
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক ট্যাবু দূর করতে জাতীয় প্রচার কার্যক্রম
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে গুরুত্ব না দিলে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
✍️ মন্তব্য লিখুন