নিজস্ব প্রতিবেদক | নরসিংদী
প্রায় ২৫ বছর আগে পরিবার থেকে হারিয়ে যাওয়া এক নারীর শেষ ঠিকানা হয়ে উঠেছিল নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘বুবি’ নামে। কোনো বেতন ছাড়াই বছরের পর বছর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, শৌচাগার ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতেন তিনি। সম্প্রতি দুর্বৃত্তের হামলায় তাঁর মৃত্যু হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দেখে অবশেষে তাঁর সন্ধান পান পরিবারের সদস্যরা। তবে জীবিত নয়, তাঁদের পৌঁছাতে হয়েছে তাঁর কবরের সামনে।
রোববার নরসিংদীর নুরপুর কবরস্থানে বুবি বেগম (ওয়াহিদা বেগম)-এর কবর জিয়ারত করেন পরিবারের ১৩ সদস্য। তাঁরা বগুড়ার গাবতলী উপজেলা থেকে মাইক্রোবাসে করে আসেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তিনজন বাক্প্রতিবন্ধী ভাইবোনও ছিলেন। কবর জিয়ারতের সময় স্বজনেরা দোয়া করেন এবং আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্বামী ও একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন ওয়াহিদা বেগম। পরে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজের পরিচয় জানাতে না পারায় তিনি দীর্ঘদিন নিখোঁজই থেকে যান। শেষ পর্যন্ত মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী আশ্রয়। স্থানীয়রা তাঁকে ‘বুবি’ নামে চিনতেন।
স্টেশনে বসবাসের সময় কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী না হয়েও তিনি স্বেচ্ছায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। যাত্রী ও স্থানীয়দের দেওয়া সামান্য অর্থ জমিয়ে রাখতেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সঞ্চিত অর্থ লুটের উদ্দেশ্যে গত ৪ জুলাই রাতে দুর্বৃত্তরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিন দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ এবং তাঁদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে তাঁরা একসময় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে তাঁরা নিশ্চিত হন যে নিহত নারীই তাঁদের হারিয়ে যাওয়া স্বজন।
বুবির ছোট বোনের জামাতা সৈকত ইসলাম বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সঞ্চিত অর্থের কোনো দাবি নেই। সেই অর্থ স্থানীয় এতিমখানা, মসজিদ বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হলে তাঁরা খুশি হবেন। তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো দীর্ঘ ২৫ বছর পর হলেও স্বজনের কবর জিয়ারত করতে পারা।
✍️ মন্তব্য লিখুন