কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ‘পীর’ পরিচয়ে পরিচিত আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি তালিকা ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাইরাল ভিডিওতে হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া যাদের দেখা গেছে, তাদের অনেকের নাম মামলায় নেই; বরং ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
গত ১১ এপ্রিল দুপুরে সংঘটিত এ হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, লাঠিসোঁটা, রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে একদল লোক মিছিল করে শামীমের আস্তানায় প্রবেশ করে। তারা ভাঙচুর চালিয়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে মারধর ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হামলায় নারীসহ অন্তত সাতজন আহত হন এবং আস্তানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
ভিডিওতে সক্রিয়, মামলায় অনুপস্থিত
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের কিছু নেতাকর্মী সামনের সারিতে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে গ্রামবাসীকে সংগঠিত করা হয় এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ভাইরাল ভিডিওর একটি অংশে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি সরাসরি হামলায় অংশ নিচ্ছেন এবং ঘটনাটি ধারণও করছেন। তবে এসব ব্যক্তির কারও নাম মামলার এজাহারে নেই—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
মামলায় যাদের নাম
নিহতের পরিবারের দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক এক নেতাকে। দ্বিতীয় আসামি হিসেবে রয়েছেন খেলাফত মজলিসের এক স্থানীয় নেতা। এছাড়া আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ জনকে।
মামলার বাদী, নিহতের ভাই ফজলুর রহমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, “কাকে আসামি করা হয়েছে, কেন করা হয়েছে—এসব বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।”
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযোগ
জামায়াত-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে, পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতাকর্মীদের মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাদের দাবি, ঘটনাস্থলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের লোকজন উপস্থিত থাকলেও তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অন্যদিকে স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, এটি কোনো দলীয় সিদ্ধান্তে সংঘটিত হামলা নয়। ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বলেন, “এটি এলাকার মানুষের ক্ষোভ থেকে হওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এখানে নির্দিষ্ট কোনো দলকে দায়ী করা কঠিন।”
পুলিশের বক্তব্য: তদন্তে বদল আসতে পারে
পুলিশ বলছে, মামলার এজাহার বাদীপক্ষের দেওয়া হলেও তদন্তের ভিত্তিতে প্রকৃত আসামি শনাক্ত করা হবে। ভেড়ামারা-দৌলতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন জানান, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যসহ সব তথ্য যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তাদের নামেই মামলা হয়েছে। তবে তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে নতুন আসামি যুক্ত হতে পারে, আবার নির্দোষদের বাদও দেওয়া হতে পারে।”
প্রশ্নের মুখে নিরপেক্ষতা
স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অন্যদের আসামি করায় মামলার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার অন্যরা বলছেন, ঘটনার পেছনে স্থানীয় ক্ষোভও বড় ভূমিকা রেখেছে, ফলে এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় এলাকায় এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তদন্তের অগ্রগতি ও প্রকৃত দায়ীদের শনাক্তকরণের ওপরই নির্ভর করছে পরিস্থিতির পরবর্তী দিক।
✍️ মন্তব্য লিখুন