পদ্মা সেতু, তাজা ইলিশ আর মুক্ত দক্ষিণা বাতাস—সব মিলিয়ে পদ্মা পাড়ে ছড়িয়ে পড়ছে অনাবিল মুগ্ধতা। এই সৌন্দর্য দিন দিন আকৃষ্ট করছে পর্যটকদের। ইট-পাথরের কর্মব্যস্ত কংক্রিটের নগরী ছেড়ে সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা বিশেষ দিনে মানুষ ছুটে আসছেন মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের পুরাতন শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায়।
পদ্মা সেতু প্রকল্প রক্ষা বাঁধের তীর ঘেঁষে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য যেন একই স্থানে, কাছ থেকেই উপভোগ করা যায়। নদীর নির্মল স্নিগ্ধতা আর প্রকৃতির ছোঁয়ায় ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও প্রমোদতরিতে পদ্মা ভ্রমণ।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, পর্যটকদের ইলিশের চাহিদা মেটাতে মাওয়া প্রান্তে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই শতাধিক ছোট-বড় খাবার হোটেল। পাশাপাশি রয়েছে প্রমোদতরিতে বিলাসবহুল ইলিশ ভোজনের ব্যবস্থা। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ভাসমান হোটেলগুলোতেও বেড়েছে পর্যটকদের আনাগোনা।
তবে পর্যটকদের অভিযোগ, এলাকায় পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি, গাড়ি পার্কিং সুবিধা ও পরিচ্ছন্ন টয়লেটের অভাব রয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীদের প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে দ্রুত সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও প্রমোদতরিতে পদ্মা ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেট কিংবা দুর্ঘটনা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
মাওয়া প্রান্তে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ, তদারকির অভাবে নদীতে ঘোরানোর সময় ফেরার পথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেন ট্রলার মালিকরা। তবে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সিদ্দিক মণ্ডল দাবি করেন, ঘাট এলাকায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে।
ঘাট এলাকায় দেখা গেছে, ঘণ্টাভিত্তিক চুক্তিতে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ভাড়া করা হচ্ছে। আবার বিভিন্ন ট্রলারে জনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং স্পিডবোটে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় পদ্মা ভ্রমণে অংশ নিচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
রাজধানীর গুলশান থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, প্রশান্তির খোঁজে পদ্মা পাড়ে এলেও নিরাপত্তা ও তদারকির অভাব তাকে হতাশ করেছে। তাঁর অভিযোগ, নির্ধারিত নিয়ম ছাড়াই ট্রলারগুলো ইচ্ছেমতো সময় ও ভাড়া নির্ধারণ করছে।
অন্যদিকে, সুদূর জার্মানি থেকে দেশে বেড়াতে আসা এক প্রবাসী বাংলাদেশি জানান, বিশ্বের নানা প্রান্তের সৌন্দর্য দেখলেও পদ্মা পাড়ের সৌন্দর্য তাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। তবে অব্যবস্থাপনার কারণে কিছুটা অসন্তোষও প্রকাশ করেন তিনি।
এছাড়া সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি পদ্মা পাড়ে সূর্যাস্তের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করে স্মৃতি তৈরি করলেও যাত্রী ছাউনি ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট না থাকায় ভোগান্তির কথা জানান।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত বিশ্বের মতো নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ও যুগোপযোগী উদ্যোগ নেওয়া না হলে হুমকির মুখে পড়বে জীববৈচিত্র্যসহ নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন ও জীবিকা।

✍️ মন্তব্য লিখুন