ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাত্র ৪৫ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ২০৪ শিশু। শয্যা তো দূরের কথা, ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দাতেও জায়গা মিলছে না অনেক রোগীর। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের সামনের গাছতলায় বিছানা পেতে অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা করাচ্ছেন অভিভাবকেরা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডের ভেতরে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগী অবস্থান করছে। কোথাও একটি শয্যায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হয়েছে। আবার জায়গা না পেয়ে অনেক অভিভাবক তাঁদের অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালের সামনের গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। কারও শিশুর হাতে চলছে স্যালাইন, কেউ অপেক্ষা করছেন চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। রোগীর অতিরিক্ত চাপে ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিবেশ। গরম ও ভিড়ের কারণে শিশুদের পাশাপাশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের স্বজনদেরও।
পঞ্চগড় থেকে ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে আসা বিউটি বেগম জানান, তাঁর নাতি টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত। ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম এবং অতিরিক্ত ভিড়। একটি বিছানায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। এ কারণে বেশির ভাগ সময় শিশুটিকে নিয়ে বাইরে থাকতে হচ্ছে। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন হলে তাঁকে ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে হয়।
শুধু শয্যাসংকট নয়, হাসপাতালের পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনেরা। তাঁদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। শৌচাগার অপরিচ্ছন্ন এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এতে শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন একাধিক অভিভাবক। তাঁদের দাবি, স্যালাইন সেট, ক্যানুলা, সিরিঞ্জ, মেডিকেল টেপসহ বিভিন্ন সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। কেউ কেউ কয়েক দিনের চিকিৎসায় কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করার কথাও জানিয়েছেন।
হাসপাতালের গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন জানান, শৌচাগারগুলোর মধ্যে দুটিতে সমস্যা রয়েছে। অন্য চারটি চালু আছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান জুয়েল রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ৪৫ শয্যার বিপরীতে কখনো কখনো প্রায় ২৫০ শিশু ভর্তি থাকে। প্রতিটি শিশুর সঙ্গে মা-বাবা বা স্বজনেরা থাকায় ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।
তিনি জানান, পানি ও শৌচাগারের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহের বিষয়ে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্টোরকে বিষয়টি জানানো হবে। পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে শুধু রোগী ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের মতো সংবেদনশীল রোগীদের খোলা আকাশের নিচে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা হাসপাতালের সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন