
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
ঘুষের অভিযোগ জানাতে ‘ঘুষ.সাইট’ নামে ওয়েবসাইট তৈরি করে আলোচনায় আসা ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শাহেদ শরীফ আহমেদের খোঁজ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একই সঙ্গে তাঁর উদ্যোগ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং এ কাজে সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে কথা বলেছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ৩টার দিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কার্যালয়ে শাহেদের সঙ্গে এ বৈঠক হয়। বৈঠকে ‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা এবং উদ্যোগটি কীভাবে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
সিটি প্রশাসক রুকুনোজ্জামান জানান, সোমবার রাতে প্রথম আলোতে প্রকাশিত শাহেদকে নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা একজন তাঁকে পাঠান। এরপর শাহেদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বৈঠকের আলোচনার বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। তবে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শাহেদকে নিয়ে কোনো বিশেষ নির্দেশনা আসেনি।
শাহেদ জানান, সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে শাহেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং উদ্যোগটি কীভাবে সামনে এগিয়ে নিতে চান, সে বিষয়ে জানতে চান।
মায়ের পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে অভিজ্ঞতা
শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির পেছনে রয়েছে তাঁর নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতা। তাঁর মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
মায়ের মৃত্যুর পর প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ সরকারি পাওনা তুলতে গিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭ লাখ টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ তুলতে কয়েকটি দপ্তরে মোট ৩৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য পাওনা তুলতেও ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
নিজের পাসপোর্ট করাতেও ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহেদ। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ঘুষের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর একটি উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কয়েক দিনে হাজারো অভিযোগ
শাহেদ গত ২১ আগস্ট ‘ঘুষ.সাইট’ চালু করেন। ওয়েবসাইটটিতে মানুষ পরিচয় গোপন রেখে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারেন। ওয়েবসাইট চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই এতে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ জমা পড়ে।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ওয়েবসাইটটিতে ১১ হাজার ৬৬৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানানো হয়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৩৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা। তবে ওয়েবসাইটে জমা পড়া অভিযোগগুলো স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
শাহেদের উদ্যোগের খবর প্রকাশের পর তাঁর মায়ের পাওনা অর্থসংক্রান্ত অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় এ বিষয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারি সহযোগিতা চান শাহেদ
শাহেদ বর্তমানে শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি ‘ঘুষ.সাইট’ পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁর ওপর কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সরকারি পর্যায়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা স্বীকৃতি পেলে উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে এবং একই সঙ্গে পড়াশোনার ওপর চাপও কমবে।
সিটি প্রশাসকও শাহেদের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কাজ করতে আগ্রহী তরুণদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
ঘুষের অভিযোগ জানানোর একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শাহেদের উদ্যোগ ইতিমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযোগের সংখ্যা যত বাড়ছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন