ইয়ানূর রহমান : বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে দেশে আনা হয়েছে টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলামের (৭০) মরদেহ।
শনিবার (১লা মার্চ-২০২৬) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগা থানার হরিদাসপুর ইমিগ্রেশন পুলিশ-বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন।
গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুারি) রাতে ভারতের কলকাতার দমদম এলাকায় অবস্থিত ফিনিক্স মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে এক সপ্তাহের বেশি সময় তিনি ওই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং তিন দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তার স্বজনরা জানিয়েছেন ভারতের চিকিৎসকরা বলেছেন-মাল্টি অর্গান ফেইলিওর ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যুকালে তার পাশে স্ত্রী ও এক মেয়ে উপস্থিত ছিলেন। অসুস্থতার খবর পেয়ে তার মেয়ে ও স্ত্রী মেডিকেল ভিসায় কলকাতায় যান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দেশের মাটিতে দাফনের ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পর কলকাতা দূতাবাস থেকে প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ করা হয়। লাশ সংরক্ষণের জন্য কলকাতার ‘পিস হেভেন’-এ রাখা হয়েছিল।
জানা যায়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পটপরিবর্তনের পর পলাতক ছিলেন জহিরুল ইসলাম। তবে তার এলাকায় গুঞ্জন ছিল তিনি দেশত্যাগ করে ভারতে চলে গেছেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার নিউটাউনে বসবাস শুরু করেন। তবে বাংলাদেশ বা কলকাতায় তাকে প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা গেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা ছিল। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা ছিল বলে জানা যায়।
২০২৫ সালের ৮ মার্চ এক তরুণী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক পরিচয়ে তার পরিবারের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে ও চাঁদা না পেয়ে তার বাড়ি দখল করে ভাঙচুর, লুটপাট চালায় ও “পাগলের আশ্রম” চালু করে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে বাড়িটি দখলমুক্ত করে এবং ওই তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জীবন ও রাজনৈতিক পথচলায় জোয়াহেরুল ইসলাম টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার বেড়বাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা পরান আলী মিয়া এবং মাতা মালেকা বেগম। শিক্ষাজীবনে তিনি স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশায় তিনি টাঙ্গাইল আদালতের একজন আইনজীবী ছিলেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক, ১৯৮০ সালে সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং ১৯৮৩ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের টাঙ্গাইল জেলা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। ১৯৮৭-৮৮ ও ১৯৮৯-৯০ মেয়াদে সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘ভিপি জোয়াহের’ নামেই তিনি অধিক পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৭ সালে পুনরায় এ পদে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে অংশ নিয়ে আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর কন্যা কুড়ি সিদ্দিকীকে পরাজিত করে টাঙ্গাইল-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলীয় সংগঠন শক্তিশালীকরণে ভূমিকা রাখেন এবং নিজ এলাকায় শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে তার অনুসারীরা জানিয়েছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, নিজ জন্মভূমি সখীপুরেই তাকে দাফন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরিবার থেকে পরে জানানো হবে।
তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা।
বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাখাওয়াত হোসেন জানান প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহত সাবেক সংসদ সদস্য জোয়াহেরুল ইসলামের মরদেহ তার পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

✍️ মন্তব্য লিখুন