নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও সনদ প্রদান, সংবাদ প্রকাশের কারণে আর্থিক জরিমানা এবং পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে আরও ক্ষমতা চায় বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। এ জন্য ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন ও ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। তবে বৈঠকে উপস্থিত এক সদস্যের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রস্তাবগুলো নিয়ে কমিটিতে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
সম্পাদক হতে স্নাতক ও ১০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রস্তাব
প্রেস কাউন্সিলের খসড়া প্রস্তাবে সংবাদপত্রের সম্পাদক হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং অন্তত ১০ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
কাউন্সিলের মতে, বিদ্যমান আইনে সম্পাদকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার বিষয়গুলো যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট নয়। ফলে সম্পাদক হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে আরও স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন।
এ ছাড়া ভুয়া সাংবাদিক শনাক্ত করতে অনলাইন তথ্যভাণ্ডার তৈরি, সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থা এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও নিউজ পোর্টালকে প্রেস কাউন্সিলের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
মিথ্যা সংবাদ প্রকাশে জরিমানার ক্ষমতা
মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও সাংবাদিকতার নীতিবিরোধী সংবাদ প্রকাশের অভিযোগে সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকদের আর্থিক জরিমানা করার ক্ষমতা চায় প্রেস কাউন্সিল। একই সঙ্গে গুজব, ভুয়া খবর ও ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগে স্বপ্রণোদিতভাবে তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও চাওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মবের ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও রয়েছে।
প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনে ১৯টি এবং ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন সংশোধনে সাতটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের বেতন ও পেশাগত নিরাপত্তায় গুরুত্ব
সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র দেওয়া এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি। কোনো সংবাদপত্রে সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র না দেওয়া হলে বা টানা তিন মাস বেতন-ভাতা বকেয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার ঘোষণাপত্র বাতিলের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত সংবাদপত্রের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়া, সংবাদপত্রের নিয়মিত প্রকাশনা তদারক এবং প্রেস কাউন্সিলের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রচারসংখ্যার ভিত্তিতে লেভি আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বপ্রণোদিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর মতে, আইন সংশোধনের আগে সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
প্রেস কাউন্সিলের প্রস্তাবগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর আইন সংশোধনের অগ্রগতি নির্ভর করবে। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে সাংবাদিকদের নিবন্ধন, পেশাগত জবাবদিহি এবং সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
✍️ মন্তব্য লিখুন