সহ-সম্পাদক রাজু আনোয়ার-এর লেখনী
রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আবারও চলছে উচ্ছেদ অভিযান। কোথাও ফুটপাত খালি হচ্ছে, কোথাও হকারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হচ্ছে, কোথাও আবার অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আগের চিত্র ফিরে আসছে।
প্রশ্ন হলো—এই সমস্যার দায় কি শুধু হকারদের? নাকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদেরও একটি প্রশ্ন করা উচিত?
আমরাই তো প্রতিদিন হকারের কাছ থেকে কিনছি।
আমরা চাই ফুটপাত দখলমুক্ত থাকুক। চাই রাস্তা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে। চাই যানজট কমুক। চাই শহরটা পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত হোক।
কিন্তু একই সঙ্গে আমরা ফুটপাতের দোকান থেকে জামা, জুতা, ব্যাগ, খাবার, ফল, প্রসাধনীসহ নানা পণ্য কিনছি। দোকানে কয়েকশ টাকা বেশি লাগবে বলে ফুটপাতের দোকান বেছে নিচ্ছি। অর্থাৎ একদিকে আমরা হকার উচ্ছেদ চাইছি, অন্যদিকে আমাদের কেনাকাটার মাধ্যমেই সেই ব্যবসার চাহিদা তৈরি করছি।
এখানেই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লুকিয়ে আছে।
শুধু হকারকে সরিয়ে দিলেই কি হকার সমস্যা শেষ হবে?
একজন মানুষ যেখানে ক্রেতা পাচ্ছেন, সেখানে ব্যবসা করবেন—এটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
যদি ফুটপাতে বসে প্রতিদিন ভালো বিক্রি হয়, তাহলে সেখানে আবার বসার চেষ্টা হবে। আজ একজনকে সরিয়ে দেওয়া হলো, কাল আরেকজন এলেন। অভিযান হলো, মালামাল সরানো হলো, ফুটপাত খালি হলো, কিন্তু ক্রেতা যদি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে কিছুদিন পর সেই জায়গায় আবার ব্যবসা ফিরে আসার সম্ভাবনাও থাকবে।
এই কারণেই শুধু উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—হকার কোথায় বসবে, কীভাবে বসবে এবং আমরা কোথা থেকে কিনব?
তবে হকারদেরও কি কোনো দায় নেই?
অবশ্যই আছে।
জীবিকা নির্বাহের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্য মানুষের চলাচলের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।
ফুটপাত মূলত পথচারীদের জন্য। একজন হকার যদি পুরো ফুটপাত দখল করে বসেন, পথচারীকে যদি রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়, দোকানের মালামাল যদি চলাচলের জায়গা আটকে রাখে, ক্রেতাদের ভিড়ে যদি যানজট তৈরি হয়—তাহলে সেটিকে শুধু ‘জীবিকার অধিকার’ দিয়ে বৈধতা দেওয়া যায় না।
আরেকটি বিষয়ও সামনে আসে—কিছু ক্ষেত্রে ছোট অস্থায়ী দোকানের আড়ালে তুলনামূলক বড় ব্যবসার কাঠামো গড়ে ওঠে। কারও একাধিক গুদাম বা সরবরাহব্যবস্থা থাকতে পারে। ফলে প্রকৃত ক্ষুদ্র হকার আর বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের একই চোখে দেখা উচিত নয়।
কর, নিবন্ধন, লাইসেন্স এবং পণ্যের বৈধতার প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অর্থাৎ হকার হলেই সব নিয়মের ঊর্ধ্বে থাকা যাবে না।
কিন্তু ক্রেতার দায়টাও কি আমরা স্বীকার করব?
এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি।
আমরা অনেক সময় বলি, ‘হকাররা ফুটপাত দখল করে রেখেছে।’
কিন্তু খুব কমই বলি—‘আমি কেন সেখানে গিয়ে কিনছি?’
একজন হকার যদি বুঝতে পারেন, ফুটপাতে বসে বিক্রি করলে প্রতিদিন শত শত ক্রেতা আসবেন, তাহলে তিনি সেখানে বসার অর্থনৈতিক কারণও খুঁজে পাবেন।
আমরা যদি ফুটপাতের অবৈধ দোকান থেকে কেনাকাটা বন্ধ করি, সেই ব্যবসার চাহিদা কমবে।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে একজন সাধারণ ক্রেতাকেই হকার সমস্যার জন্য দায়ী করা হবে। মানুষের আয়, পণ্যের দাম এবং প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হবে। অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সস্তা পণ্যের জন্য ফুটপাতের বাজারের ওপর নির্ভর করেন।
কিন্তু চাহিদা ও সরবরাহের সম্পর্কও অস্বীকার করা যাবে না।
আমরা যেখানে টাকা খরচ করি, সেখানেই ব্যবসা গড়ে ওঠে।
তাহলে সমাধান কী?
সমাধান হওয়া উচিত তিন পক্ষের দায়িত্বের সমন্বয়ে।
প্রথমত, সরকার ও সিটি করপোরেশনকে নির্দিষ্ট জায়গা, সময় ও সংখ্যার ভিত্তিতে হকার ব্যবস্থাপনা করতে হবে। কে প্রকৃত হকার, কে বড় ব্যবসায়ী—নিবন্ধনের মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করতে হবে। নির্ধারিত এলাকার বাইরে ব্যবসা করলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, হকারদেরও ফুটপাতকে নিজের স্থায়ী দোকান মনে করা বন্ধ করতে হবে। পথচারীর জায়গা আটকে ব্যবসা করা, রাস্তা দখল করা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা বা নিয়ম না মানার অধিকার কারও নেই।
তৃতীয়ত, আমাদের ক্রেতাদেরও নিজেদের আচরণ নিয়ে ভাবতে হবে। সস্তা বলে যেকোনো জায়গা থেকে কেনাকাটা করার আগে ভাবতে হবে—আমার কেনাকাটা কি শহরের ফুটপাত দখলের এই অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে?
হকার থাকবে, কিন্তু ফুটপাতও থাকবে।
হকারদের সবাইকে শহর থেকে সরিয়ে দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত সমাধান নয়, তেমনি ফুটপাতকে হকারদের স্থায়ী বাজার বানিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা দরকার যেখানে হকারের জীবিকা থাকবে, কিন্তু পথচারীর অধিকারও থাকবে।
যেখানে ব্যবসা হবে নির্দিষ্ট জায়গায়, নির্দিষ্ট নিয়মে।
যেখানে প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুযোগ পাবেন, কিন্তু বড় ব্যবসার আড়ালে ফুটপাত দখলের সুযোগ থাকবে না।
আর যেখানে আমরা ক্রেতারাও বুঝব—শহরের কোনো সমস্যার জন্য শুধু ‘ওদের’ দায়ী করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সহজ অর্থনৈতিক সত্য থেকেই যায়—যেখানে আমরা ক্রেতা হয়ে দাঁড়াই, সেখানে কেউ না কেউ বিক্রেতা হয়ে দাঁড়াবেই।
তাই হকার উচ্ছেদের প্রশ্নের পাশাপাশি আমাদের নিজেদের কাছেও প্রশ্ন রাখা দরকার—
আমরা কি সত্যিই ফুটপাত দখলমুক্ত শহর চাই, নাকি শুধু চাই ফুটপাতটা খালি থাকুক—যতক্ষণ না আমাদের সস্তায় কেনাকাটা করতে হয়?
হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান শুধু উচ্ছেদে নয়; প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত পুনর্বাসন, কঠোর নিয়ম প্রয়োগ এবং একই সঙ্গে ক্রেতা হিসেবে আমাদের আচরণে পরিবর্তন।
শহরটা শুধু হকারের নয়, শুধু দোকানদারেরও নয়, শুধু সরকারেরও নয়, শহরটা আমাদের সবার। তাই সমাধানের দায়ও আমাদের সবার।

✍️ মন্তব্য লিখুন