কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠানোর সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছিল। ধারদেনা করে জোগাড় করা হয়েছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, ছেলে বিদেশে গিয়ে আয় করে সংসারের অভাব-অনটন দূর করবেন। সেই ছেলেকে বিমানে তুলে দিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকার পথে রওনা হয়েছিলেন মা। কিন্তু পথেই ঘটে গেল মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। প্রাণ হারালেন মা। আহত হয়েছেন বাবা ও প্রবাসগামী ছেলেও। ফলে আপাতত থমকে গেছে ছেলের প্রবাসযাত্রা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাকুন্দিয়া উপজেলার পুলেরঘাট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত নারীর নাম মোছা. জয়বাহার (৪৫)। তিনি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্বগ্রাম শান্তিপুর গ্রামের রাশিদ মিয়ার স্ত্রী।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ছেলে মো. নিরবকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন পরিবারের সদস্যরা। পুলেরঘাট এলাকায় পৌঁছালে তাঁদের বহনকারী গাড়িটির সঙ্গে একটি পণ্যবাহী লরির সংঘর্ষ হয়। এতে গাড়িতে থাকা জয়বাহারসহ কয়েকজন আহত হন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জয়বাহারের অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল। তবে নরসিংদীর ইটেরখোলা এলাকায় পৌঁছানোর আগেই গাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনায় আহত ছেলে নিরব অভিযোগ করেন, কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁরা দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর মায়ের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয় বলে তাঁর দাবি। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
নিহতের ভাতিজা আল আমিন জানান, আগামী শুক্রবার নিরবের সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তুতি হিসেবে পরিবারটি ঋণ করে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা জোগাড় করেছিল। কিন্তু দুর্ঘটনায় জয়বাহারের মৃত্যুতে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, রাশিদ মিয়া ও জয়বাহার দম্পতির তিন মেয়ে ও এক ছেলে। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর স্বপ্ন দেখছিলেন তাঁরা। ছেলের প্রবাসযাত্রার প্রস্তুতির মধ্যেই মায়ের এমন মৃত্যু পরিবারটির সেই স্বপ্নকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
স্ত্রীকে হারিয়ে রাশিদ মিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ঋণ করে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা জোগাড় করেছিলাম। এখন স্ত্রীকে হারিয়ে আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। কটিয়াদী হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ নবীনুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার অভিযোগ পাওয়ার পর পণ্যবাহী লরিটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
একদিকে মায়ের মৃত্যু, অন্যদিকে ছেলের বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত—একটি দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেছে ইটনার ওই পরিবারের বহুদিনের স্বপ্ন।
✍️ মন্তব্য লিখুন