কূটনৈতিক রিপোর্টার
প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ জানিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত চীন, ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতরা রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও কৌশলগত অংশীদারত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বৈঠকে রাষ্ট্রদূতরা নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যতে কার্যকর সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তারা নির্বাচনের ফলাফলের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বে জোর
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বৈঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রতি বেইজিংয়ের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও গভীর ও বিস্তৃত করতে চায় চীন।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ–চীন ‘সমগ্র কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’কে এগিয়ে নেওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানে চীনের সক্রিয় ও ফলপ্রসূ ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে চীনের কার্যকর সম্পৃক্ততা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সুবিধাজনক সময়ে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, উচ্চপর্যায়ের সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন গতি দেবে।
ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতমুখী ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার বিষয়ে নয়াদিল্লির প্রস্তুতির কথা জানান। তিনি বলেন, বিদ্যমান সহযোগিতা কাঠামোকে আরও বহুমাত্রিক ও সম্প্রসারিত করার সুযোগ রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও লাভের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি ভবিষ্যতমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিলে উভয় দেশের জনগণই উপকৃত হবে।
বৈঠকে দুই পক্ষ নিয়মিত ও গঠনমূলক সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হন। এ সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর-এর পক্ষ থেকে খলিলুর রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেওয়া হয়, যা তিনি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন।
পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান
অন্যদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উভয় দেশের জনগণের কল্যাণে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র অনুসন্ধানে বাংলাদেশ উন্মুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, সংযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণকে ঢাকার অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, পৃথক সাক্ষাৎগুলোতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা গড়ে তোলার ওপর সব পক্ষই গুরুত্বারোপ করে।
বৈঠক শেষে তিন দেশের রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন এবং চলমান কূটনৈতিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাব্য দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার তিন গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রতিনিধিদের এমন সৌজন্য সাক্ষাৎ নতুন সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে বহুপাক্ষিক ভারসাম্য রক্ষা, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখার বার্তাও এতে স্পষ্ট হয়েছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন