নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের নারায়ণপুর ইউনিয়নের জোহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে চারজন সরকারি শিক্ষক কর্মরত থাকলেও বাস্তবে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন স্থানীয় নারী। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে মাসিক তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিকে তিনি শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি শিক্ষকেরা অধিকাংশ সময় জেলা শহরে অবস্থান করেন এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। মাঝেমধ্যে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে দ্রুত চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষককে পর্যন্ত চিনতে পারে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিলরুবা খাতুন নামে এক নারীকে অনানুষ্ঠানিকভাবে পাঠদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি কোনো নিয়োগ ছাড়াই তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন। অথচ তার পারিশ্রমিক মাত্র তিন হাজার টাকা, যা সরকারি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অধিকাংশ দিন শিক্ষক না আসায় তারা খেলাধুলা করে বাড়ি ফিরে যায়। এতে লেখাপড়ায় মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং অনেক শিক্ষার্থী বর্ণমালাও ঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারছে না। স্থানীয় অভিভাবকেরা বলছেন, বছরের পর বছর এমন পরিস্থিতি চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গণমাধ্যমের প্রতিনিধি বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর খবর পেয়ে সহকারী শিক্ষক নেওয়াজ শরীফ সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একসঙ্গে কয়েক দিনের অগ্রিম হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। এ বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন যে, নিজের বেতন থেকে স্থানীয় ওই নারীকে কিছু অর্থ দেওয়া হয়। তবে চরাঞ্চলে যাতায়াতের সমস্যার কারণেই নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয় না বলে তিনি দাবি করেন।
অভিভাবকেরা আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষক সংকটের কারণে মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ের পিয়নকেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে দেখা যায়। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতি শিশুদের শিক্ষাজীবনকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, চরাঞ্চলে নৌযানের সময়সূচির কারণে শিক্ষকদের যাতায়াতে কিছু সমস্যা রয়েছে। তিনি স্থানীয়ভাবে ‘প্যারা শিক্ষক’ রাখার বিষয়টিকে একটি প্রচলিত ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করলেও মাসের পর মাস শিক্ষকদের অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।
শিক্ষাবিদদের মতে, দুর্গম চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত তদারকি, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা এবং অবকাঠামোগত সমস্যার দ্রুত সমাধান জরুরি। অন্যথায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
✍️ মন্তব্য লিখুন