
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের ব্যস্ততম এলাকা দিলকুশায় দাঁড়িয়ে থাকা বঙ্গভবন শুধু রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন নয়—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী। আজকের এই রাষ্ট্রীয় ভবনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন একটি মাজার, নবাব পরিবারের বাগানবাড়ি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তান আমলের গভর্নর হাউস এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস।
### মাজার থেকে ইতিহাসের শুরু
বঙ্গভবনের বর্তমান স্থানটি নিয়ে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, সুলতানি আমলে সুফি সাধক হজরত শাহজালাল দাক্ষিণী ও তাঁর অনুসারীদের এখানে সমাহিত করা হয়েছিল। পরে স্থানটি তাঁর ভক্তদের কাছে মাজার হিসেবে পরিচিতি পায়। বঙ্গভবনের ভেতরেও একটি পুরোনো একগম্বুজ স্থাপনা রয়েছে, যেটিকে শাহজালাল দাক্ষিণীর সমাধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এই অংশের ইতিহাসের কিছু বিবরণ ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক সূত্রনির্ভর; সব তথ্য নিয়ে গবেষকদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য নেই।
### নবাব পরিবারের দিলকুশা বাগানবাড়ি
পরবর্তী সময়ে এই এলাকার মালিকানা বদলায়। উনিশ শতকে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি দিলকুশা এলাকায় জমি কিনে একটি বাগানবাড়ি গড়ে তোলেন। ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সেই বাগানবাড়ির নাম দেওয়া হয় ‘দিলকুশা’, যার অর্থ হৃদয়প্রিয় বা মনোরম। সময়ের সঙ্গে দিলকুশা ঢাকার অভিজাত নবাব পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাগানবাড়িতে পরিণত হয়।
### ব্রিটিশ আমলে বদলে গেল চরিত্র
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হলে প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে ব্রিটিশ সরকার দিলকুশার জায়গাটি অধিগ্রহণ করে। সেখানে নির্মিত হয় ‘গভর্নমেন্ট হাউস’। ১৯০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার এখান থেকেই তাঁর সরকারি কার্যক্রম শুরু করেন।
অর্থাৎ, যে জায়গাটি একসময় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং পরে নবাব পরিবারের বাগানবাড়িতে পরিণত হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় রূপ নেয়।
### গভর্নমেন্ট হাউস থেকে গভর্নর হাউস
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হলে ভবনটির নাম হয় ‘গভর্নর হাউস’। এটি পূর্ববঙ্গের গভর্নরের সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৫৫ সালে পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করা হলে ভবনটির রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব আরও বাড়ে।
১৯৬১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ভবনটির বিভিন্ন অংশ নতুন রূপ পায়।
### মুক্তিযুদ্ধের পর নাম হলো ‘বঙ্গভবন’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভবনটির ইতিহাসে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকের মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক গভর্নর হাউসে অনুষ্ঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা সেই বৈঠকে অংশ নেন।
সেই বৈঠকেই গভর্নর হাউসের নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়—‘বঙ্গভবন’। নামটির মধ্য দিয়ে ভবনটি ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি প্রশাসনিক পরিচয় পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
### রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন
স্বাধীনতার পর বঙ্গভবন হয়ে ওঠে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজনও করা হয় এখানে।
বর্তমানে ঢাকার দিলকুশা এলাকায় অবস্থিত বঙ্গভবন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রতীক।
### এক স্থাপনায় বহু যুগের গল্প
বঙ্গভবনের ইতিহাস তাই কেবল একটি ভবনের ইতিহাস নয়। একটি ধর্মীয় স্মৃতিচিহ্ন থেকে নবাবদের বাগানবাড়ি, সেখান থেকে ব্রিটিশ সরকারের ‘গভর্নমেন্ট হাউস’, পাকিস্তান আমলের ‘গভর্নর হাউস’ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ‘বঙ্গভবন’—একই ভূখণ্ড সময়ের সঙ্গে বারবার তার পরিচয় বদলেছে।
আজ রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও বাসভবন হিসেবে বঙ্গভবন যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তার দেয়াল ও প্রাঙ্গণ যেন ঢাকার কয়েক শত বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের নীরব সাক্ষ্য বহন করে।
**তথ্যসূত্র:** রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, বাংলাদেশ; বাংলাপিডিয়া; ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বঙ্গভবনের ইতিহাসবিষয়ক প্রকাশিত তথ্য।
✍️ মন্তব্য লিখুন