জুলাই আন্দোলন চলাকালে গুলিতে শহীদ হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর নবগঠিত জুলাই ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব নেন তার জমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। পরবর্তীতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।
স্নিগ্ধকে আক্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অভিযোগগুলোর একটি হলো ‘ভাই ব্যবসা’। এই অভিযোগের জবাব দিয়ে স্নিগ্ধ বলেন, ভাইয়ের হত্যার বিচারের জন্য শুরু থেকেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, এইভাবে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়, তখন রাজনৈতিকভাবে বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। মাত্র ২০ টাকার একটি ফর্ম পূরণ করে দলে যোগ দিয়েছি, এই আশায় যে বিচার নিয়ে রাজনৈতিকভাবে কাজ করতে পারব। এখন বলুন, আমি কীভাবে ‘ভাই ব্যবসা’ করলাম?
রোববার (২৫ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি।
পোস্টে স্নিগ্ধ লেখেন, ‘ভাই ব্যবসায়ী’ শব্দটি আসলে কীভাবে যুক্তিসংগত হয়? আমার একটি সাজানো-গোছানো জীবন ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, কোনো কিছুর অভাব ছিল না। একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম।
তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ, হাতখরচ, নিজের শখ-আহ্লাদ—সবকিছুই নিজের উপার্জিত অর্থ থেকেই পূরণ করেছি। নিজের বাইকসহ জীবনের অনেক স্বপ্ন নিজের টাকায় বাস্তবায়ন করেছি।
স্নিগ্ধ আরও বলেন, ‘এরপর আসে জুলাই ২০২৪। আমি আমার ভাইকে হারাই। শত হুমকির মুখেও “মুগ্ধর পানি লাগবে” ভিডিওটি প্রকাশ করে পুরো বিশ্বের কাছে বিচারের দাবি জানাই। সেটি জুলাই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্টে পরিণত হয়।’
বিচারের আশায় বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আদালত, থানা থেকে শুরু করে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে পায়ের চপ্পল ক্ষয়ে গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ব্যাংক ও বিভিন্ন অফিসে নিজে উপস্থিত হয়ে সিসিটিভি ফুটেজসহ মুগ্ধর হত্যাকাণ্ডের সব প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন বলে জানান।
স্নিগ্ধ বলেন, দেশের বাইরে পড়াশোনা করে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ ছেড়ে দিয়ে মুগ্ধসহ জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে জুলাই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হই। সেখানে শুধু আমি নই, ছাত্র উপদেষ্টা থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের আরও পরিচিত মুখেরা যুক্ত ছিলেন। সবাই মিলে সর্বোচ্চ সততার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছি।
রাজনৈতিকভাবে বিচারের পথ বেছে নেওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আজও মনে পড়ে—পাবলিক বাসে ধাক্কা খেতে খেতে এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে ঘুরে ফাউন্ডেশনটিকে দাঁড় করিয়েছি। এই সময় ফ্রিল্যান্সিং থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আমার ক্যারিয়ার প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তবুও হাল ছাড়িনি।
তিনি আরও বলেন, ভাইয়ের হত্যার বিচারের জন্য এখান থেকে সেখান লড়াই এখনো চলছে। কিন্তু যখন বুঝলাম, এইভাবে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়, তখন রাজনৈতিকভাবে বিচার নিশ্চিত করার জন্য রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।
তিনি বলেন, “এখন বলুন আমি কিভাবে ‘ভাই ব্যবসা’ করলাম? এই দেশে কেউ দায়িত্ব পালন করলে সে সৎভাবেও দায়িত্ব পালন করতে পারে, এই বিশ্বাসটা আমরা কেন রাখতে পারি না? কোনো প্রমাণ ছাড়াই কিভাবে আমরা কাউকে অসৎ ট্যাগ দিয়ে দিই? তাহলে কি আপনাদের মতে, এসব না করে ভাই হত্যার বিচারের জন্য কাজ না করে নিজের নিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই চলে যাওয়াই আমার জন্য শ্রেয় ছিল? প্রশ্ন রেখে গেলাম।”
সবশেষে বলেন, ‘রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানেই কী সে ব্যবসায়ী? রাজনীতি তো কোনো ব্যবসা নয়। আর যারা রাজনীতিকে ব্যবসা বানিয়েছে—আপনারা কি তাদেরই বারবার জিতিয়ে দিচ্ছেন না?’

✍️ মন্তব্য লিখুন