আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার নেপথ্যে প্রথমে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও নতুন বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত হওয়া কম্পনটি আসলে একটি **হিমবাহ ধস ও বরফ-পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ**। এর পরই নদীপথে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদা।
২৬ আগস্ট সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীর অববাহিকায় আকস্মিক এই দুর্যোগ শুরু হয়। পাহাড়ের ওপর থেকে বিশাল বরফ ও পাথরের স্তর ধসে নিচে পড়ার পর নদীর গতিপথে বাধা তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে ছুটে যায়। স্রোতের তোড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
### প্রথমে কেন ভূমিকম্পের কথা উঠেছিল
দুর্যোগের সময় ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে শক্তিশালী কম্পন ধরা পড়ে। USGS প্রথমে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। পরে আশপাশের ভূকম্পনকেন্দ্রের তথ্য, দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন তরঙ্গ এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি সিদ্ধান্তে আসে যে ওই কম্পনের উৎস ভূমিকম্প নয়; বরং হিমবাহ ধস ও তার সঙ্গে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ।
USGS-এর পরবর্তী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পনের মতো সংকেত তৈরি করেছিল। কিন্তু সেটি ছিল হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ভর নিচে নেমে আসার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পনীয় কম্পন। অর্থাৎ **ভূমিকম্প বন্যার সরাসরি কারণ ছিল—এমন প্রমাণ এখন পাওয়া যায়নি।**
### কীভাবে হিমবাহ ধস বন্যা তৈরি করল
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে নিচের উপত্যকায় পড়ে। কয়েক হাজার ফুট নিচে আছড়ে পড়া বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল ভর নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। পরে সেই অস্থায়ী বাধা ভেঙে গিয়ে সৃষ্টি হয় অত্যন্ত শক্তিশালী আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত।
নেপালের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তথ্যেও বলা হয়েছিল, বরফের ধসের পর নদীতে অস্থায়ী জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পরে সেটি ভেঙে পড়ায় ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে ধ্বংসাবশেষ জমে সাময়িকভাবে পানি আটকে থাকতে পারে।
### একসঙ্গে কয়েকটি বিপদের প্রভাব
এই দুর্যোগকে শুধু ‘বন্যা’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এখানে একের পর এক কয়েকটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে—হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়া, বরফ-পাথরের ধস, নদীর প্রবাহে সাময়িক বাধা এবং পরে সেই বাধা ভেঙে আকস্মিক বন্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন এ ধরনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এবারের হিমবাহ ধসের নির্দিষ্ট তাৎক্ষণিক কারণ কী ছিল—তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। নেপালের কর্মকর্তারা এর আগে ওই সময়ের কাছাকাছি একটি ভূমিকম্প সম্ভাব্য ট্রিগার হতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন; কিন্তু USGS-এর পরবর্তী বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প হিসেবে সমর্থন করা হয়নি।
### প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে
ভয়াবহ এই বন্যায় নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। ২৭ আগস্টের সর্বশেষ প্রতিবেদনে নেপালে অন্তত **১৬২ জনের মৃত্যুর** কথা জানানো হয়েছে। তিব্বতেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের খবর রয়েছে। দুই পাশে কয়েক শ মানুষ এখনো নিখোঁজ, যাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপাল ও চীনের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং নদীর পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
### হিমালয়ে বাড়ছে নতুন ধরনের ঝুঁকি
নেপালের এবারের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, হিমালয়ের দুর্যোগ শুধু ভূমিকম্প বা অতিবৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, বরফ-পাথরের ধস, অস্থায়ী নদীবাঁধ এবং আকস্মিক জলপ্রবাহ একসঙ্গে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, নদীর পানির তাৎক্ষণিক তথ্য এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত সতর্কবার্তা আদান-প্রদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
**সুতরাং, নেপালের সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী বন্যাকে ভূমিকম্পের ফল হিসেবে দেখার প্রাথমিক ধারণা এখন বদলে গেছে। বর্তমান বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে হিমবাহ ধস, বরফ-পাথরের প্রবাহ এবং নদীতে সৃষ্ট আকস্মিক বাধা ভেঙে যাওয়াকেই এই বিপর্যয়ের মূল প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।**
✍️ মন্তব্য লিখুন