বরগুনা প্রতিনিধি
দীর্ঘ ৩২ বছর পর পরিবারের সন্ধান পেয়েছেন বরগুনার আছিয়া। ১৬–১৭ বছর বয়সে ঢাকার মিরপুরের বড়বাগ এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর পাচারের শিকার হয়ে তিনি পাকিস্তানে চলে যান। তিন দশকের বেশি সময় পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এখন ৯০ বছর বয়সী বাবাকে একবার চোখের দেখা দেখতে দেশে ফিরতে চান আছিয়া।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে জীবিকার সন্ধানে বরগুনা থেকে ঢাকায় যান আছিয়ার বাবা তমিজ উদ্দিন হাওলাদার। তাঁরা মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ১৯৯৪ সালের দিকে এক বিকেলে বরগুনায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন আছিয়া। এরপর আর ফেরেননি তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন খোঁজ করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একসময় মেয়েকে হারানোর বেদনা নিয়েই গ্রামে ফিরে আসে পরিবার।
আছিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার সদরঘাট এলাকায় এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই নারী তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সঙ্গে নেন। পরে তাঁকে অচেতন করে প্রথমে ভারতে নেওয়া হয়। সেখানে একটি ঘরে কয়েক দিন আটকে রাখার পর তাঁকে পাকিস্তানের মোজাফফরনগরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপির বিনিময়ে তাঁকে একজনের কাছে বিক্রি করা হয় বলে জানান আছিয়া।
পাকিস্তানে তাঁর বিয়ে হয়। বর্তমানে তাঁর ছয় মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের পরিবারের কথা আরও বেশি মনে পড়তে থাকে তাঁর। একপর্যায়ে তাঁর বড় মেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়ের পরিচয় ও বাংলাদেশে থাকা বাবার ঠিকানা উল্লেখ করে পোস্ট দেন। সেই পোস্টের সূত্র ধরেই বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়।
আছিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে স্থানীয় রিয়াজ উদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছিয়ার পরিবারের সন্ধানের পোস্ট দেখে তিনি বিষয়টি স্থানীয়ভাবে যাচাই করেন। পরে আছিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ছবি পাঠানো হয়। ছবিগুলো দেখে আছিয়া তাঁর বাবা, ভাই ও বোনদের শনাক্ত করেন। এরপর থেকে মোবাইল ফোনে নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।
বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামে এখনো মেয়ের অপেক্ষায় আছেন বৃদ্ধ তমিজ উদ্দিন। ভিডিও কলে মেয়ের মুখ দেখলে কখনো হাসেন, আবার কখনো চোখের পানি মুছতে দেখা যায় তাঁকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মেয়ের সন্ধান পেলেও এখনো তাঁকে কাছে থেকে দেখতে পারেননি তিনি।
আছিয়ার ভাই মোস্তফা বলেন, এত বছর ধরে তাঁরা বোনের বেঁচে থাকার আশাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। হঠাৎ তাঁর সন্ধান পাওয়ায় পরিবারের সবাই আবেগাপ্লুত। এখন তাঁদের একমাত্র চাওয়া, আছিয়া যেন নিরাপদে দেশে ফিরে আসতে পারেন।
আছিয়া জানান, দেশে ফেরার জন্য তিনি পাকিস্তানে পাসপোর্টের আবেদন করেছেন। তবে দেশে ফিরতে কয়েক লাখ পাকিস্তানি রুপি প্রয়োজন বলে জানতে পেরেছেন, যা তাঁর পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। তাই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা চান তিনি। তাঁর ভাষায়, ৩২ বছর পর পরিবারের সন্ধান পেয়েছেন; এবার শুধু বাবার কাছে ফিরে যেতে চান।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার জানিয়েছেন, আছিয়ার বাংলাদেশি পরিচয় বা নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র থাকলে পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলে বাংলাদেশে থাকা স্বজনরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারবেন। বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৩২ বছর আগে যে মেয়েকে হারিয়ে পরিবার প্রায় আশাহীন হয়ে পড়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সেই মেয়েরই সন্ধান মিলেছে। এখন পরিবারের অপেক্ষা—দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আছিয়া কবে ফিরবেন তাঁর জন্মভূমিতে, আর কবে ৯০ বছর বয়সী বাবার সঙ্গে হবে সেই বহু প্রতীক্ষিত সাক্ষাৎ।
✍️ মন্তব্য লিখুন