নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে নানা সমীকরণ সামনে এসেছে। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা গত জুলাইয়ে বার্তা দিয়েছিলেন, ডিসেম্বরের দিকে তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। এরপর গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক অডিও বক্তব্যেও তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কথা জানান।
তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন এখন শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারিক প্রক্রিয়া, ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রশ্ন। ফলে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য কয়েকটি নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, কিন্তু পথ অনিশ্চিত
শেখ হাসিনা ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশ ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়কে তিনি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এর আগে জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও নিজের দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করে প্রথম আলো। সেখানে বলা হয়, শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা বাস্তব পরিকল্পনা, নাকি দলকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কৌশল—এ নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সরকারের অবস্থান কঠোর
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তিনি দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আদালতের রায় আইন অনুযায়ী কার্যকর করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করাই তাদের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করলে সরকার তাঁকে স্বাগত জানাবে। তাঁর ভাষ্য, আদালতের কার্যক্রমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে এবং প্রয়োজনে বিদেশি আইনজীবীর সহায়তাও নেওয়া যাবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর বলেছেন, ভারত থেকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।
ভারতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ভারত কী সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনাও তৈরি হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে। অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে হয়েছে এবং এতে ভারতের সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এখন দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সামনে নিয়ে এসেছে। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে নিষিদ্ধ। শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।
তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন মানেই আওয়ামী লীগ দ্রুত আগের অবস্থানে ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং দলটির মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক সক্ষমতা, নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস, মামলায় জড়িত নেতাকর্মীদের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণেও প্রশ্ন উঠেছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে কতজন নেতা-কর্মী দেশে ফিরতে প্রস্তুত এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা কী ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে পারবেন।
বিএনপির জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি তাই ক্ষমতাসীন দলের জন্যও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে বিএনপি সরকার শেখ হাসিনাকে আইনের আওতায় আনার অবস্থান ধরে রেখেছে; অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেশের বিরোধী রাজনীতির কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিচার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং মাঠের রাজনীতি—এই তিনটি বিষয় একই সময়ে সরকারের সামনে আসবে।
সামনে যে প্রশ্নগুলো
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেয় কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ দেশে ফেরার জন্য তাঁকে ভারত থেকে বের হওয়ার সুযোগ, প্রত্যর্পণসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের বিচারিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আলোচনা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। তাঁর দেশে ফেরা হলে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন ঘটবে না; একই সঙ্গে বিচার, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছুতেই নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হতে পারে।
তাই ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এখনই নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হচ্ছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন