ডেস্ক রিপোর্ট
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে পড়া এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বহু দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা International Energy Agency (IEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সতর্কতা জারি করেছে। কিছু দেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—যেমন লাওস-এ স্কুল সপ্তাহ কমিয়ে আনা হয়েছে, আর নেপাল-এ গ্যাস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট অতীতের মতো নয়। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের সময় বিশ্ব বিকল্প শক্তির জন্য ততটা প্রস্তুত ছিল না। এখন সৌর, বায়ু ও বৈদ্যুতিক শক্তি অনেক বেশি সহজলভ্য এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। ফলে সংকটটি উল্টো নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গতি যোগাচ্ছে।
বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের বড় একটি অংশ সড়ক পরিবহনে ব্যবহৃত হয়, যা সহজেই বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরযোগ্য। এর প্রভাব ইতোমধ্যে ইউরোপে দৃশ্যমান—ইলেকট্রিক যানবাহনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপ-এর বিভিন্ন দেশে গত এক বছরে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে এশিয়ার দেশগুলোও দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করছে। ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে একটি বড় এলএনজি প্রকল্প বাতিল করে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। ভারত গত এক দশকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং জ্বালানি বৈচিত্র্যে গুরুত্ব দিচ্ছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া-সহ আরও কয়েকটি দেশ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উঠে এসেছে চীন। দেশটি ইতোমধ্যেই সৌর প্যানেল, ব্যাটারি এবং সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। অনেকেই একে সুয়েজ সংকট-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, যা একসময় বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনেছিল।
সব মিলিয়ে, ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই জ্বালানি সংকট বিশ্বকে এক নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে—যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তিই হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের প্রধান ভরসা।
✍️ মন্তব্য লিখুন